মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সহযোগীদের জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খোলা না থাকলেও তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শেষ করতে প্রস্তুত। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, এমন সিদ্ধান্তের ফলে জলপথটির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং এটি পুনরায় চালুর জটিল কাজ ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে দেখেন, সংকীর্ণ এই নৌপথ জোরপূর্বক উদ্ধার করার অভিযান নির্ধারিত চার থেকে ছয় সপ্তাহের সময়সীমা অতিক্রম করতে পারে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ইরানের নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা এবং ধীরে ধীরে সংঘাত কমিয়ে আনা। পাশাপাশি মুক্ত বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে তেহরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে ওয়াশিংটন ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে, যাতে তারা প্রণালি পুনরায় চালুর নেতৃত্ব দেয়। যদিও সামরিক বিকল্প এখনো রয়েছে, তবে তা তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।
গত এক মাসে ট্রাম্প জনসমক্ষে হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য করেছেন। কখনো তিনি সতর্ক করে বলেছেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রণালি খোলা না হলে বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালানো হবে। আবার অন্য সময় তিনি মন্তব্য করেছেন, এই প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং এর সমাধানে অন্য দেশগুলোরই বেশি ভূমিকা রাখা উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা বাড়বে এবং জ্বালানির দাম আরও বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রসহ বিভিন্ন দেশ বিপাকে পড়েছে। একই সঙ্গে সার উৎপাদন ও কম্পিউটার চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত হিলিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ঘাটতিও দেখা দিতে শুরু করেছে।
ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইরান বিশেষজ্ঞ সুজান মালোনি বলেছেন, প্রণালি পুনরায় চালু না করেই সামরিক অভিযান শেষ করা ‘অবিশ্বাস্য রকম দায়িত্বজ্ঞানহীন’ সিদ্ধান্ত হবে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে এই যুদ্ধ শুরু করেছে, তাই এর পরিণতি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি বাজার বৈশ্বিক হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এই অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে আলাদা রাখতে পারবে না।
অন্যদিকে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু পদক্ষেপ এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ সপ্তাহান্তে ইউএসএস ট্রিপোলি এবং ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট ওই অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। পাশাপাশি ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের কিছু অংশ মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আরও প্রায় ১০ হাজার সেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প কখনো এই যুদ্ধকে ‘একটি ভ্রমণ’ বা ‘চমৎকার অবস্থান’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, আবার একই সঙ্গে ইরানের ইউরেনিয়াম দখলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ মিশনের কথাও ভাবছেন বলে জানা গেছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। তবে ইরানের নৌবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার মূল সামরিক লক্ষ্যগুলোর তালিকায় প্রণালি খোলা এখনো অন্তর্ভুক্ত নয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও আল আল জাজিরাকে বলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বর্তমান সামরিক অভিযান শেষ হতে পারে। এরপর হরমুজ প্রণালি খোলা থাকবে কি না, তা ইরানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে অথবা যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক জোট নিশ্চিত করবে যেন এটি যেকোনো উপায়ে চালু থাকে।
প্রথম দফা বোমা হামলার পর থেকেই মার্কিন প্রশাসন আশঙ্কা করেছিল, ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। পরবর্তীতে ইরান পানিতে মাইন স্থাপন এবং ট্যাংকারে হামলার হুমকি দিলে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। শুরুতে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও পরে চাপ বাড়তে থাকে।
সমস্যা সমাধানে প্রথমে ট্রাম্প জাহাজ কোম্পানিগুলোকে ঝুঁকি নিয়ে চলাচলের আহ্বান জানান। পরে সরাসরি ইরানকে হুমকি দিতে শুরু করেন। যদিও কিছু জাহাজ চলাচল শুরু হলে তিনি সেটিকে কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখেন।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইরানকে ‘যুক্তিবাদী’ বলে উল্লেখ করার পরপরই তিনি আবারও সতর্ক করেন—যদি দ্রুত প্রণালি ব্যবসার জন্য খুলে দেওয়া না হয়, তবে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও খাড়গ দ্বীপসহ তেল রপ্তানি কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা হতে পারে।
কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল হলে প্রণালি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও কমে আসবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা, এই প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের ওপর দায়িত্ব ভাগ করে দিতে চাইছে।
ইতোমধ্যে প্রায় ৪০টি দেশ—যেমন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ২০২৪ সালে এই পথ দিয়ে পরিবাহিত তেলের ৮৪ শতাংশ এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের ৮৩ শতাংশ এশিয়ার বাজারে গেছে। বর্তমানে ইরানের নিয়ন্ত্রণের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা ২০২২ সালের পর প্রথম। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দাম ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এনএনবাংলা/পিএইচ


আরও পড়ুন
২০০৯ সালের পর জন্মগ্রহণকারীদের ধূমপান নিষিদ্ধ, আইন করছে যুক্তরাজ্য
তিন বছরে ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ, আরও বহু ঝুঁকিতে: বিজিএমইএ
মাথাপিছু আয়ে ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ: আইএমএফ