কালজানি নদীর ভাঙনে বিলীন বসতভিটা ও আবাদি জমি, আতঙ্কে দুই গ্রামের মানুষ
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের উত্তর ঢলডাঙ্গা ও কাজিয়ার চর এলাকায় কালজানি নদীর তীব্র ভাঙন মারাত্নক আকার ধারণ করেছে। এ নদীর তীব্র ভাঙনে উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা উত্তর ধলডাঙ্গা ও দক্ষিণ ধলডাঙ্গা গ্রামে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, গত তিন দিনে দুই গ্রামের অন্তত ১০০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে উত্তর ধলডাঙ্গায় ৭০টি এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গায় ৩০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বসতভিটা ও আবাদি জমিসহ নানা স্থাপনা কালজানি নদীর তীব্র ভাঙনে বিলিন হচ্ছে।
ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও শতাধিক পরিবার। এসব নদী পাড়ের মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলি জমি রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে অনেক পরিবার এখন বসতঘর সরিয়ে নিতে ব্যস্ত।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা মোমেনা বেগম এখন ভিটে মাটি হারিয়ে অসহায়। তার মতো শত শত মানুষ এখন কালজানি নদীর ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ বসতভিটা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে, কেউবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
শিলখুড়ি ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন জানান, গত এক বছরে কালজানি নদী বাম তীর থেকে গড়ে প্রায় ১০০ মিটার ভেতরে ঢুকে গেছে। এতে গত এক বছরে প্রায় এক হাজার পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী উত্তর ধলডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয় ও এলাকার বউবাজারও নদীভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীরা জানান,উত্তর ধলডাঙ্গা এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গায় ১ হাজার ৬০ মিটার এলাকাজুড়ে নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নদীর প্রবল স্রোতে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা বিলীন হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে কালজানি নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এ সময়টাতে এখানে দেখা দিয়েছে তীব্র নদী ভাঙন। সীমান্তঘেঁষা উত্তর ঢলডাঙ্গা ও কাজিয়ার চর এলাকায় নদীর স্রোত সরাসরি আঘাত হানায় কয়েকটি স্থানে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে।
ভাঙন কবলিত এলাকার তোফাজ্জল মিয়া বলেন, “এর আগেও কয়েকবার নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়েছি। কষ্ট করে আবার ঘর তুলেছিলাম। এখন আবার নদী ঘরের কাছাকাছি চলে এসেছে। কীভাবে পরিবার নিয়ে বাঁচব, বুঝতে পারছি না। যেকোন মুহূর্তে নদী ভাঙ্গনে আবার বাড়িছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছি।”
শাজাহান আলী নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, “দিন-রাত ঘর সরানোর কাজ করছি। নদী কখন কী নিয়ে যায়, সেই ভয়ে এখন বাস করছি। সন্তানদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব, কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না।”
একই এলাকার মোজাফ্ফর আলী বলেন, “নদী আমাদের জমি খেয়েছে, এখন ঘরও খাচ্ছে। প্রতি বছর ভাঙনের ভয় নিয়ে বাঁচতে হয়। সরকারের কাছে স্থায়ী বাঁধ চাই, যাতে বারবার উদ্বাস্তু হতে না হয়।”
শনিবার দুপুরে সরেজমিনে জানা যায়, ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কালজানি নদীর পাড়জুড়ে ভাঙন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। কেউ নিজের ঘরের চালের টিন খুলছেন, কেউ ঘরের খুঁটি উপড়ে অন্যত্র নেওয়ার চেষ্টায় দিন পার করছেন। অনেক পরিবার গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি উদ্বেগ আর উৎকন্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।

ভাঙনের শিকার উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের তোজাম্মেল হক, ময়েন উদ্দিন, সাহেজ উদ্দিন ও মনির হোসেন এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গার আব্দুল কুদ্দুস, আব্দুল জলিল, হাফিজুর রহমান ও সুরমান আলীরা জানান, প্রতিদিন নদী তাদের জীবনের নিরাপত্তা কেড়ে নিচ্ছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
ভাঙন কবলিত ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনসার আলী বলেন, “প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন আমার বাড়িতে এসে ভিড় করছেন। কেউ সহায়তা চাইছেন, কেউ ভাঙন ঠেকানোর আকুতি জানাচ্ছেন। মানুষের অসহায়ত্ব দেখে আমার নিজেরই অনেক খারাপ লাগে।”
এরকম নদী ভাঙনের খবর জেনে শনিবার বিকেলে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করতে ছুটে যান কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ। তিনি নদী ভাঙন কবলিত মানুষজনের ভাঙন এলাকা পরিদর্শনসহ তাদের দুঃখ দুর্দশার কথা শুনেন। এসময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কুদরত-এ-খুদা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জাকির হোসেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বেনজীর রহমান এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু এবং জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সঙ্গে ছিলেন।
উত্তর ধলডাঙ্গায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আহাজারি দেখে জেলা প্রশাসকসহ উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নারী-পুরুষেরা তাঁদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেন প্রশাসনের কাছে।
আনোয়ারা বেগম ও আকলিমা বেগম বলেন, “ভিটেমাটি হারিয়ে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। এক পাশে নদী, আরেক পাশে ভারতীয় সীমান্ত। আমরা যাব কোথায়? দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, “যতটুকু ভাঙন হয়েছে, হয়েছে। এখন আর যাতে কালজানি নদী মানুষের বসতভিটা কেড়ে নিতে না পারে, সে জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। খুব দ্রুতই ভাঙন প্রতিরোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হবে।”
তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে ২ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হবে। প্রয়োজনে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী কাল থেকেই কাজ শুরু করব। প্রথম ধাপে ২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে আরও ব্যাগ সরবরাহ করা হবে।”
চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ বাংলাদেশের একটি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। কিন্তু ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না।”
তিনি আরও বলেন, “পৃথিবীর অনেক দেশে, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসসহ নদী বিধৌত দেশগুলোতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন সহায়তা দেয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। প্রয়োজনে সংসদে আইন পাস করে নদী ভাঙন কবলিত মানুষের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে।”
তাদের একটাই প্রশ্ন—জিও ব্যাগ কি পারবে কালজানির আগ্রাসন থামাতে? নাকি আরও শত শত পরিবারকে ভিটেমাটি হারিয়ে নতুন করে উদ্বাস্তু হতে হবে? জেলার ভূরুঙ্গামারীর কালজানির পাড়ে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আজ পুরো ধলডাঙ্গাবাসী।
এনএনবাংলা/
