রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিশ্বকে এক টেবিলে আনতে চায় বাংলাদেশ

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত আইরিন খান বলেছেন, সংকট সমাধানে শুধু জাতিসংঘের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধারী দেশগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
সম্প্রতি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের এ প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি কার্যকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া তৈরি করা জরুরি।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন ও সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতেই রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন আইরিন খান।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অঙ্গীকার ও বাস্তব পদক্ষেপের ঘাটতিই বড় সমস্যা। তাঁর মতে, প্রথমত বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংকটের সময়ে বাংলাদেশ সরকারের পাশে দাঁড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
আইরিন খান বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী জনগোষ্ঠীগুলোর একটি বর্তমানে বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোতে বসবাস করছে। দীর্ঘদিন ধরে শিবিরে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের একটি বড় অংশ শরণার্থী শিবিরেই বেড়ে উঠছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, প্রায় নয় বছর ধরে রোহিঙ্গারা শিবিরে অবস্থান করছে। প্রতি বছর সেখানে বিপুলসংখ্যক শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে সময়ের সঙ্গে শরণার্থী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকটের মূল উৎস মিয়ানমারে উল্লেখ করে আইরিন খান বলেন, এর স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গারাও নিজ দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী। তবে তারা নিরাপত্তা, মর্যাদা ও প্রয়োজনীয় অধিকার নিশ্চিত করে প্রত্যাবাসন চায়।
বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশা তুলে ধরে আইরিন খান বলেন, জাতিসংঘের উচিত সংকটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একটি আলোচনার টেবিলে আনা। এতে বাংলাদেশসহ আশ্রয়দাতা দেশ, মিয়ানমার, আঞ্চলিক দেশগুলো এবং মিয়ানমারের ওপর প্রভাব রয়েছে বা সংকট সমাধানে অর্থায়নের সক্ষমতা রয়েছে—এমন দূরবর্তী দেশগুলোকেও যুক্ত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারকে নিজ দেশের বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালনে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ভেতরে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গে আইরিন খান বলেন, এ ধরনের জটিল সংকট একা জাতিসংঘের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। সদস্যরাষ্ট্রগুলোকেও নিজেদের দায়িত্ব আরও গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে। বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধারী দেশগুলোর সমন্বিত ও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের অবস্থান অনুযায়ী, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক চাপ এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিই এখন মূল অগ্রাধিকার। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হলে শরণার্থী শিবিরে নতুন প্রজন্মের বেড়ে ওঠা এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘাটতি সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এনএনবাংলা/এনজেড
