সাম্প্রতিক
Skip to content

ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, মারধরের শিকার ফরাসি মেয়র

ছবিঃ সংগৃহীত

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের একটি বহরে হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা। এ সময় সফররত এক ফরাসি মেয়রকেও মারধর করা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

শনিবারের এ ঘটনার এক দিন আগে এক মার্কিন ফটোসাংবাদিকও বর্বর হামলার শিকার হন। এ পরিস্থিতিতে পশ্চিম তীরে সম্ভাব্য ‘সংকট’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলে অনুষ্ঠিতব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আগে পশ্চিম তীরে সহিংসতা বেড়েছে। একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুম চলছে। ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের ধারাবাহিক হামলায় এ কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্বাচনে নিজের ডানপন্থী ও বসতি স্থাপনপন্থী সমর্থকদের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

শনিবার ৭৮ বছর বয়সী ফরাসি মেয়র বার্নার্ড বোদু জানান, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জলপাইচাষিদের সঙ্গে জলপাই সংগ্রহে অংশ নেওয়ার সময় মুখোশধারী বসতি স্থাপনকারীরা তাকে আক্রমণ করে। এ সময় তাকে লক্ষ্য করে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয় এবং লাথি মারা হয় ও লোহার রড দিয়ে আঘাত করা হয়।ওই সময় জেরুজালেমে নিযুক্ত ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের শীর্ষ প্রতিনিধিদের পাশাপাশি পোল্যান্ডের কূটনীতিকেরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

উত্তর ফ্রান্সের অলনোয়া-এমেরি শহরের মেয়র বোদু হামলার পর বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমি মনে করি, বসতি স্থাপনকারীরা যদি এ ধরনের আচরণ করে, তাহলে এর পেছনে ইসরাইল সরকারের একধরনের প্রশ্রয় রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের সবাইকে জানতে হবে এখানে কী ঘটছে। আমি দেশে ফিরে যাব, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু যারা এখানে থেকে যাচ্ছেন, সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদেরই।’

ফ্রান্সের নীল, সাদা ও লাল রঙের জাতীয় পতাকার প্রতীকসংবলিত ফিতা পরা অবস্থায় হামলার পর বোদুকে একটি গাড়ির পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তবে তার হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো এক বিবৃতিতে বলেন, বোদুর ওপর হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করতে হবে এবং ইসরাইলকে ‘অপরাধমূলক সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে’।বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও একই ধরনের আহ্বান জানিয়েছেন।

এর মাত্র এক দিন আগে হামলার শিকার হন মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর ফটোসাংবাদিক হেইডি লেভিন। তার মেরুদণ্ডের কয়েকটি কশেরুকা (মেরুদণ্ডের ছোট হাড়) ভেঙে গেছে।শনিবার তার শারীরিক অবস্থা মাঝারি পর্যায়ে ছিল বলে জানা গেছে।শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘আমরা ওই ছবিগুলো এবং যা দেখছি, তা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’

তিনি আরও বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম তীরে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা সংকট দেখতে চান না।রুবিওর ভাষায়, ট্রাম্প সেখানে নতুন করে কোনো সংঘাতের সূত্রপাতও চান না।

কূটনীতিকদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইসরাইলি পুলিশ।তবে চলতি মাসের নির্বাচনে বসতি স্থাপনপন্থী উগ্র ডানপন্থীদের সমর্থন ধরে রাখতে চাওয়া প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগকে ‘অপপ্রচার’ বলে দাবি করেছেন।

নেতানিয়াহু বলেন, কূটনীতিকদের চলাচলের বিষয়ে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা উচিত ছিল।তিনি আরও উল্লেখ করেন, ফরাসি মেয়র বোদু একজন কমিউনিস্ট এবং তিনি ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে পরিচিত।নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট এ সহিংসতার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করে সমালোচনা করেছেন।

তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা ইসরাইল রাষ্ট্রের যে সামান্য বৈধতা এখনো অবশিষ্ট রয়েছে, তা-ও নষ্ট করে দিচ্ছে।আইজেনকোটের ভাষায়, ‘এটি ইসরাইলি সরকারের প্রশ্রয়ে সংঘটিত ইহুদি সন্ত্রাসবাদ।’

অন্যদিকে, মূলত আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনকারী ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ শনিবার হাসপাতালে হেইডি লেভিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।হামলাটিকে ‘আপত্তিকর ও মর্মান্তিক’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঘটনাটি তার বিবেককে নাড়া দিয়েছে।ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এই মারধরের ঘটনাকে ‘মুখোশধারী কাপুরুষদের সংঘটিত ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছেন।একই সঙ্গে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে কারাগারে পাঠানোর জন্য ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

জলপাই সংগ্রহকে ঘিরে হামলা

ফরাসি মেয়র বোদু জানান, ফ্রান্স থেকে আসা তার স্থানীয় যাজককে সঙ্গে নিয়ে তিনি পশ্চিম তীরের খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত শহর তাইবেতে গিয়েছিলেন। সেখানে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির একটি চুক্তি স্বাক্ষর করার কথা ছিল তাদের।

ফিলিস্তিনি কৃষকদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে জলপাই সংগ্রহে অংশ নেওয়ার সময় তিনি হামলার শিকার হন। ফিলিস্তিনিদের কাছে জলপাই শুধু কৃষিপণ্য নয়, বরং তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।রুবিও জলপাই সংগ্রহের মৌসুমের বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ নিয়ে আরও কিছু অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে।

গত কয়েক মাসে ফিলিস্তিনিদের জলপাই সংগ্রহ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরাইলের উগ্রপন্থীরা। এ সময় বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের জমি ও সম্পত্তি দখলের অভিযোগও উঠেছে।

তাইবের যাজক বাশার ফাওয়াদলেহ জানান, বসতি স্থাপনকারীরা জলপাই সংগ্রহের সময় কৃষকদের ওপর হামলা চালায় এবং জলপাই কেড়ে নেয়। এরপর তারা ফরাসি মেয়রকেও মারধর করে।তিনি এএফপিকে বলেন, ‘একজনের মাথায় আঘাত করা হয়েছে এবং তার মাথায় সেলাই দিতে হয়েছে। ৭০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকেও অপমান করার পর মারধর করা হয়েছে।’পশ্চিম তীরে চলমান সহিংসতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপে নেতৃত্ব দিয়েছে। এর জেরে ইসরায়েল জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দিয়েছে।

ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের একটি ছাতাসংগঠনের প্রধান ইসরায়েল গ্যান্টজ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর জন্য ‘উসকানিদাতা ও সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে’ দায়ী করেছেন। তবে তার বক্তব্যে কিছু ইসরাইলির দায় থাকার বিষয়টিও পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে।

চলতি মাসের শুরুর দিকে জলপাই সংগ্রহ নিয়ে উত্তেজনা ও সহিংসতার খবর সংগ্রহ করার সময় এএফপির ফটোসাংবাদিক জাফর আশতিয়েকেও মারধর করা হয়। ওই হামলায় তার কয়েকটি পাঁজরের হাড় ভেঙে যায় এবং তার ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের বসতি স্থাপন অবৈধ। তবে নেতানিয়াহুর সরকার সেখানে নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন বাড়িয়েছে।১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর দখল করে ইসরাইল। বর্তমানে ওই ভূখণ্ডে প্রায় পাঁচ লাখ ইসরাইলি বসবাস করছেন। তাদের পাশাপাশি সেখানে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বাস করছেন।

এনএনবাংলা/ইএস