টোকিওতে মিয়ানমার-যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোপন’ বৈঠক

পাঁচ বছর পর মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এরই ধারাবাহিকতায় জাপানের রাজধানী টোকিওতে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি ‘গোপন’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এক মাসের মধ্যে এটি ছিল ওয়াশিংটন ও নেপিডোর প্রতিনিধিদের দ্বিতীয় আলোচনা। বৈঠকে মিয়ানমার থেকে বিরল খনিজ আমদানি এবং দেশটিতে পরিচালিত প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করে দেশটির সেনাবাহিনী। এরপর থেকে জান্তা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এড়িয়ে চলছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সম্প্রতি সেই অবস্থান থেকে সরে এসে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন।
এর আগে গত মাসে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণাবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্সের সঙ্গে দেশটির সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইংয়ের বৈঠক হয়। ওই আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে আরও যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। এর অল্প সময়ের ব্যবধানে টোকিওতে দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ায় দুই পক্ষের আলোচনা অব্যাহত রাখার আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
দ্বিতীয় বৈঠকেও মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন মাইকেল ভ্যান্স। তবে মিয়ানমারের পক্ষে কারা অংশ নিয়েছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
প্রথম বৈঠকে এক মার্কিন ব্যবসায়ীর মুক্তি নিশ্চিত করা এবং মিয়ানমারের প্রতারণাকেন্দ্রগুলো বন্ধের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। আর দ্বিতীয় বৈঠকে ভবিষ্যতে মিয়ানমার থেকে বিরল খনিজ আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধে সহযোগিতা চায় যুক্তরাষ্ট্র
মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর অন্যতম উদ্দেশ্য দেশটিতে পরিচালিত প্রতারণাচক্র ও প্রতারণাকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম বন্ধে সহযোগিতা নিশ্চিত করা। এসব চক্রের বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের কাছ থেকে শত শত কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গবেষকদের মতে, মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় সেনা-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে প্রতারণার অনেক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব কার্যক্রম থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ সামরিক বাহিনীর কাছেও পৌঁছায় বলে ধারণা করা হয়। ফলে প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধে মিয়ানমারের নেতারা কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে দেশটির সরকার জানিয়েছে, প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধে যৌথ উদ্যোগে কাজ করছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কেন্দ্রে মিয়ানমারের বিরল খনিজ
প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধের পাশাপাশি মিয়ানমারের বিরল খনিজের মজুতও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের অন্যতম কারণ। বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুতের টারবাইনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিপণ্য তৈরিতে এসব খনিজের প্রয়োজন হয়। মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে মিয়ানমারের বিরল খনিজের বড় মজুত নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে দেশটি থেকে এসব খনিজ আমদানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা রয়েছে বলেও স্বীকার করেছেন তারা।
মিয়ানমারের বিরল খনিজের মজুতের বড় অংশই বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় অবস্থিত। ফলে এসব সম্পদ সংগ্রহ ও রপ্তানির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত জটিলতা রয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমারের বিরল খনিজের প্রধান ক্রেতা চীনও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এসব খনিজ রপ্তানির বিরোধিতা করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান লোই ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক পরিচালক হান্টার মার্সটনের মতে, জাপানে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বৈঠক থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, মিয়ানমারের সঙ্গে কেবল ‘লেনদেনভিত্তিক’ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র।
মার্সটনের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের বিরল খনিজকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন। এসব সম্পদ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের বিষয়টিই যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের মূল কেন্দ্রে থাকতে পারে।
বৈঠক আয়োজনে জাপানের ভূমিকা
টোকিওতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের প্রতিনিধিদের বৈঠক আয়োজনের ক্ষেত্রে জাপানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে রয়টার্সের কাছে ইমেইলে পাঠানো এক বিবৃতিতে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুই পক্ষের সঙ্গেই প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ করেছে তারা।
তবে নির্দিষ্ট কূটনৈতিক আলোচনা নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে টোকিও।
এনএনবাংলা/
