Skip to content

৮০০ কোটি ইউরো পাচারের অভিযোগ, সাইপ্রাসে এস আলমের সম্পত্তি ক্রোক

এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম। ফাইল ছবি

ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্র সাইপ্রাসে প্রায় ৮০০ কোটি ইউরো পাচারের অভিযোগের তদন্তের মধ্যে বাংলাদেশের বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি ক্রোক করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সাইপ্রাসভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘সাইপ্রাস মেইল’ জানায়, ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে চলমান ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে নিকোসিয়া জেলা আদালত লিমাসসোল জেলার পারেকলিসিয়ায় অবস্থিত ওই সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইপ্রাসের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিট ‘মোকাস’-এর আবেদনের পর গত ১৯ মে আদালত এই ক্রোক আদেশ জারি করে। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে পারস্পরিক আইনি সহায়তা প্রক্রিয়ার আওতায় তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়।

তবে মোহাম্মদ সাইফুল আলম তার বিরুদ্ধে আনা সব ধরনের অনিয়ম ও অপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বাংলাদেশের অন্যতম বড় ও আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ প্রথমে পরিবহন ও চিনি পরিশোধন খাতে ব্যবসা শুরু করলেও পরবর্তীতে ব্যাংক, বীমা, বিদ্যুৎ, গণমাধ্যম ও হোটেল খাতে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও অনিয়মের অভিযোগে সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। আদালতের নির্দেশে তার এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ ও বিভিন্ন সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি এস আলম ও তার পরিবারের সদস্যদের। এর মধ্যে তার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করার খবরও প্রকাশ্যে আসে।

সর্বশেষ গত ২১ মে ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া ৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ না করায় এস আলমসহ ১১ জনকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত। পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।

সাইপ্রাস মেইলের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাইফুল আলম ২০১৬ সালে ‘সিটিজেন-বাই-ইনভেস্টমেন্ট’ বা ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট স্কিম’-এর মাধ্যমে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব পান। তবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের অভিযোগের পর সেই নাগরিকত্ব বাতিল করে সাইপ্রাস সরকার।

বাংলাদেশি তদন্ত সংস্থাগুলোর নথি অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রতারণামূলক ঋণ গ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংক থেকে বাস কেনার নামে নেওয়া ঋণের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ১৩৪টি বাস কেনার কথা বলে নেওয়া ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।

বাংলাদেশের তদন্তকারীরা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া বিপুল ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে কিনা তা অনুসন্ধান করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও দাবি করেছেন, এস আলম গ্রুপ প্রায় ৮০০ কোটি ইউরোর বেশি অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। তদন্তকারীদের ধারণা, সংশ্লিষ্ট সম্পদের অবস্থান সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুরসহ আরও কয়েকটি দেশে থাকতে পারে।

এছাড়া সাইপ্রাসে নিবন্ধিত ‘একলেয়ার ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি কোম্পানির কার্যক্রমও তদন্তাধীন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে অর্থ স্থানান্তরে কোম্পানিটি ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।

সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে আদালতের নথিতে সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও জার্সিভিত্তিক একাধিক কোম্পানি ও ট্রাস্ট নেটওয়ার্কের তথ্যও উঠে এসেছে। তদন্তকারীরা এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামো ও আর্থিক কার্যক্রম যাচাই করছেন।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন সংস্থা ‘কুইন ইমানুয়েল’-এর মাধ্যমে সাইফুল আলম দাবি করেছেন, তার বিদেশি বিনিয়োগ বৈধ উৎস থেকে এসেছে এবং তার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এ ঘটনায় তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (আইসিএসআইডি)’-এ আইনি প্রক্রিয়াও শুরু করেছেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেছেন, তার সম্পদে হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির লঙ্ঘন।

এনএনবাংলা/