Skip to content

বেনজীর ইস্যুতে দুদকের কাছে ৪ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইল দুবাই পুলিশ

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) গ্রেপ্তার হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে অন্তত চারটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ব্যাখ্যা (কোয়ারি) চেয়েছে দুবাই পুলিশ। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও ব্যাখ্যা খুব শিগগিরই পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে দুদক।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, দুবাই পুলিশের হাতে বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার ও দুদকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সব নথি পাঠান। সম্প্রতি দুবাই পুলিশ কয়েকটি বিষয়ে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা চেয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছে, যা দুদকের হাতে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা দ্রুতই সেই ব্যাখ্যা পাঠাবেন।

এর আগে, গত ১৬ জুন বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইংরেজি ও আরবি ভাষায় প্রস্তুত করা দুটি পৃথক প্রত্যর্পণ প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায় দুদক।

নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে কোনো আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তদন্তকারী সংস্থা বা আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এজাহার, অভিযোগপত্র এবং অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ সংযুক্ত করে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব তৈরি করা হয়। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোতে (এনসিবি) পাঠানো হয়।

দুর্নীতির মামলার আসামি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের আলোচিত ও সমালোচিত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি বাংলাদেশকে জানায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিভিত্তিক ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। গত ১২ জুন বাংলাদেশের এনসিবির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।

চিঠিতে বলা হয়, ইউএইর ‘ফৌজদারি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা সংক্রান্ত’ ফেডারেল আইন নং ৩৯/২০০৬-এর ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রত্যর্পণ চেয়ে বাংলাদেশকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠাতে হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে আরবি ভাষায় অনূদিত, যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর ও সিলযুক্ত প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত করতে হবে।

এসব নথির মধ্যে রয়েছে— প্রত্যর্পণযোগ্য ব্যক্তির নাম, পরিচয়, ছবি (যদি থাকে), জাতীয়তা, ঠিকানা ও পরিচয় শনাক্তে সহায়ক অন্যান্য তথ্য; সংশ্লিষ্ট অপরাধে প্রযোজ্য আইন, নির্ধারিত শাস্তি ও তামাদি-সংক্রান্ত বিধানের অনুলিপি; বিচারিক কর্তৃপক্ষের জারি করা আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা; মামলার বিস্তারিত বিবরণ, অপরাধের প্রকৃতি, অভিযোগ ও অপরাধ সংঘটনের স্থান; তদন্তাধীন মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি এবং দণ্ডিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে আদালতের রায়, দণ্ডাদেশ ও তা কার্যকরযোগ্য হওয়ার প্রমাণপত্র।

এর আগে, ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল)। দুর্নীতির দুটি মামলার তদন্ত চলাকালে আদালতের নির্দেশে রেড নোটিশ জারির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে আবেদন করে দুদক।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ১২ কোটির বেশি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলা হয়। ওই মামলায় চার্জশিট দাখিলের পর আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পরবর্তীতে সেই পরোয়ানার ভিত্তিতেই ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধানকালে বেনজীর আহমেদকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হলে তিনি ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট আইনজীবীর মাধ্যমে সম্পদের হিসাব জমা দেন। সেখানে তিনি ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেন।

তবে তদন্তে দুদক দাবি করে, ঘোষিত সম্পদের মধ্যে ২ কোটি ৬২ লাখ ৮৯ হাজার ৬০ টাকার তথ্য গোপন করা হয়েছে এবং ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫১ টাকার সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন বেনজীর আহমেদ। এ অভিযোগে ২০০৪ সালের দুদক আইনের ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

এ ছাড়া, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নবায়ন ও জালিয়াতির অভিযোগে বেনজীর আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলাতেও তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

এই মামলার অন্য আসামিরা হলেন— পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ফজলুল হক, মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক এবং বিভাগীয় পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, বেনজীর আহমেদ ডিআইজি ও পরে র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ছাড়াই অফিসিয়াল পাসপোর্টের পরিবর্তে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন এবং সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও আবেদনপত্রে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করেন। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বিষয়টি জেনেও যথাযথ যাচাই ছাড়া তার নামে পাসপোর্ট ইস্যুর অনুমোদন দেন।

বর্তমানে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটির বেশি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চারটি মামলা ছাড়াও পাসপোর্ট জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিংসহ মোট ছয়টি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমিসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি দুবাইয়ে থাকা দুটি ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়েছে।

গত ১৪ জুন জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ শুরু হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি ঢাকার আবেদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল বিষয়টি ইন্টারপোলে পাঠানো হয় এবং পরে ইন্টারপোল ২০২৫/২৩৯ নম্বর ফাইল ও ৫৭৪/২০২৫ কন্ট্রোল নম্বরের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে।

মন্ত্রী আরও বলেন, ওই রেড নোটিশের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের অনুরোধ জানানো হয়। পরে গত ১২ জুন আবুধাবির ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানায়, দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে ইউএই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং তিনি বর্তমানে সেখানে আটক রয়েছেন।

এনএনবাংলা/