সরকারি অফিসে ‘সালাম-ধন্যবাদ’ বাধ্যতামূলক: রূঢ় আচরণ বন্ধে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নতুন নির্দেশিকা

সরকারি অফিসে সেবা নিতে আসা নাগরিকদের ভোগান্তি কমানো এবং একটি পূর্ণাঙ্গ নাগরিকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে নতুন নির্দেশিকার খসড়া প্রস্তুত করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ‘সেবা সহজীকরণ নির্দেশিকা ২০২৬’ শীর্ষক এ খসড়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই রূঢ়, অবমাননাকর, অসৌজন্যমূলক বা বিরক্তিকর আচরণ করা যাবে না।
নির্দেশিকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাগরিকদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় সালাম বা সম্ভাষণ জানাতে উৎসাহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘অনুগ্রহ করে’, ‘ধন্যবাদ’, ‘দয়া করে’ এবং ‘আপনাকে কীভাবে সহায়তা করতে পারি’— এ ধরনের সৌজন্যমূলক ভাষা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুরো সেবা প্রক্রিয়ায় বৈষম্যহীন, ন্যায়সংগত, মানবিক ও সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
খসড়া নির্দেশিকাটি চূড়ান্ত করার আগে অংশীজনদের মতামত গ্রহণের জন্য সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দেশের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সংশোধন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে শিগগিরই এটি চূড়ান্ত করা হবে বলে জানা গেছে।
সেবা সহজীকরণের জন্য নির্দেশিকায় তিনটি মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমটি ‘মৌলিক পুনঃচিন্তন’, যেখানে শুধু সেবাই নয়, সংশ্লিষ্ট অফিসের সামগ্রিক কার্যক্রম, প্রচলিত আইন, নাগরিক চাহিদা এবং সেবার মানোন্নয়নের সম্ভাবনা বিশ্লেষণের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়টি ‘আমূল পরিবর্তন’, যার মাধ্যমে নাগরিকদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে বিদ্যমান কার্যপদ্ধতির রূপান্তর ঘটানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃতীয়টি ‘অভূতপূর্ব উন্নয়ন’, যার উদ্দেশ্য সেবা পেতে সময়, খরচ, অফিসে যাতায়াতের সংখ্যা, ধাপ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কমিয়ে নাগরিক সন্তুষ্টি বৃদ্ধি করা।
খসড়া নির্দেশিকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১৫টি করণীয়ও নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নথি ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ই-নথির ব্যবহার নিশ্চিত করা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী, শিশু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলা, পরিবেশবান্ধব ও ‘পেপারলেস’ অফিস ব্যবস্থা চালু করা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত আচরণগত ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এছাড়া সিটিজেন চার্টারে সহজীকৃত সেবার প্রসেস ম্যাপ সংযুক্ত করা এবং জাতীয় তথ্য বাতায়নে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সরকারি সেবা প্রদানে ১২টি বিষয় কঠোরভাবে পরিহার করতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে রূঢ় বা অসৌজন্যমূলক ভাষায় কথা বলা, একই তথ্য বা কাগজপত্র একাধিকবার চাওয়া এবং শুধু জটিল প্রক্রিয়াকে অনলাইনে স্থানান্তর করে সেটিকে ‘সহজীকরণ’ হিসেবে উপস্থাপন করা। এছাড়া মধ্যস্বত্বভোগী, দালালচক্র, অস্বচ্ছ যোগাযোগ বা অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে— এমন কোনো পদ্ধতি বহাল রাখা যাবে না। সহজীকরণের পর পুনরায় পুরোনো জটিল প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়ার সুযোগও থাকবে না।
নির্দেশিকার শেষাংশে বলা হয়েছে, সেবা সহজীকরণ কোনো এককালীন উদ্যোগ নয়; বরং এটি একটি চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়া। আইন, বিধি, প্রযুক্তি এবং নাগরিকদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি সেবাকে নিয়মিত পরিমার্জন ও হালনাগাদ করতে হবে।
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে মতামত ও পরামর্শ পাওয়ার পর যৌক্তিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে খুব শিগগিরই নির্দেশিকাটি চূড়ান্ত করা হবে।
এনএনবাংলা/পিএইচ
