যেসব আলোচনা-সমালোচনায় ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠান। তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে শেষ হলো এমন এক মেয়াদকাল, যা রাজনৈতিক বিতর্ক, সাংবিধানিক প্রশ্ন এবং নানা আলোচনা-সমালোচনায় বারবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টাদের শপথবাক্য পাঠ করান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মুহূর্ত, যেখানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পায়। শপথ অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলেও পরবর্তী সময়ে তাকে ঘিরে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়।
সাক্ষাৎকার ঘিরে শুরু হয় বড় বিতর্ক
২০২৪ সালের অক্টোবরে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, তার কাছে শেখ হাসিনার কোনো পদত্যাগপত্র নেই এবং তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দেওয়ার সময় পাননি। এই বক্তব্য প্রকাশের পর দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কারণ, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রপতির বক্তব্য সেই বিবরণের সঙ্গে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রনেতা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবি করে। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ হয়, পরে ঘেরাও কর্মসূচিও পালন করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পর তাকে অপসারণ করা সম্ভব কি না—এ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের জন্য সংসদে অভিশংসন প্রক্রিয়া প্রয়োজন। সে সময় সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজনৈতিক দাবি থাকলেও সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা সহজ নয়। ফলে বিতর্ক চললেও তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।
নতুন সংসদেও ছিল রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে বিতর্ক
চলতি বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতির সংসদে দেওয়া ভাষণ নিয়েও নতুন করে বিতর্ক দেখা দেয়। ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বিরোধী দল রাষ্ট্রপতির অতীত ভূমিকা, বিশেষ করে শেখ হাসিনার পদত্যাগ প্রসঙ্গ তুলে সমালোচনা করে। একপর্যায়ে বিরোধী সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরও মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক শেষ হয়নি; বরং নতুন সংসদেও তা ফিরে আসে।
সব সময় আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন
বাংলাদেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি সাধারণত সাংবিধানিক সীমার মধ্যেই দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কে খুব কমই জড়িয়েছেন। তবে মো. সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। দায়িত্ব নেওয়ার আগে তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা কিছু ঘটনা, সামাজিক মাধ্যমে পুরোনো কার্যকলাপ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তার সাংবিধানিক ভূমিকা এবং পরে দেওয়া সাক্ষাৎকার—সব মিলিয়ে তিনি এমন এক রাষ্ট্রপতিতে পরিণত হন, যাকে ঘিরে বিতর্ক কখনও পুরোপুরি থামেনি।
৭৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। যদিও রাষ্ট্রপতির পদটি সাংবিধানিকভাবে মূলত আনুষ্ঠানিক, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তার ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মো. সাহাবুদ্দিন মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তার পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এনএনবাংলা/
