সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্টে নির্বিচারে গাছ কর্তন, হচ্ছে পাচার

বনদস্যুদের থাবায় দিন দিন ছোট হয়ে আসছে বান্দরবান থানচির সাঙ্গু সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এই বনের ভেতরে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও অবাধে চলাফেরা করছে স্থানীয়রা। বনদস্যুরা গাছ কেটে নিয়ে গেলেও বন আইনে ব্যবস্থা নিচ্ছে না বন বিভাগ।
বনকর্মীরা নিয়মিত টহল দেয় না সাঙ্গু রিজার্ভে। নজির নেই বন মামলা দায়েরের। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে বনাঞ্চল ধ্বংস করছে সংঘবদ্ধ কাঠ পাচারকারী ও বনদস্যুরা।
সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট রক্ষার পরিবর্তে রিজার্ভ ধ্বংসের হোতাদের রক্ষার অভিযোগ উঠেছে বান্দরবান বন বিভাগের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযুক্তরা হলেন, বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলাম, বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী সাইফুল ইসলাম এবং থানচি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ইসরাইল হোসেন। পরিবেশবিদরা বলছেন, সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট রক্ষা করতে না পারলে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে পাহাড়ি এই অঞ্চল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাঙ্গু বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। নদীটির উৎপত্তি বান্দরবানের গহীনে সাঙ্গু-মাতামুহুরি রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে। এই নদী ফরেস্টের অন্তর্ভুক্ত আন্ধারমানিক থেকে লিকরি পেরিয়ে সাঙ্গু নদী থেকে আরও দূরে মাতাদুসরি, ব্রুংক্ষিয়াং, তংক্ষিয়াং, লাগপাই ও থাকব্রো ঝিরির সঙ্গে মিলেছে। ১৮৮০ সালে সংরক্ষিত ঘোষিত এই বনাঞ্চল দেশের একমাত্র কুমারী বনাঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
১৮৮০ সালে এই বনাঞ্চলের আয়তন ছিল ৮২ হাজার ৮০ একর। তবে বর্তমানে আয়তন অনেক কমেছে। কারণ এরই মধ্যে অনেক স্থানে বসতি গড়ে উঠেছে। অগণিত মা গাছ কেটে নিয়ে গেছে বনদস্যুরা। সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে কী পরিমাণ গাছ বিলিন হয়েছে সেই হিসাব নেই বন বিভাগের কাছে। ২০১১-২০১৫ সাল পর্যন্ত সাঙ্গু বনাঞ্চলে জরিপ চালায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ)। ২০১৬ সালে জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়। সংস্থার দেওয়া তথ্যমতে, এই বনাঞ্চল আশঙ্কাজনক হারে কমছে। ফলে ১১৩ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী এবং বিরল প্রজাতির পাখির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে।
এরপর গত ১১ বছরে সঙ্গু রিজার্ভ ধ্বংসের মুখে পড়লেও দৃশ্যত ব্যবস্থা নেয়নি বন বিভাগের নীতি নির্ধারকরা। এমনকি রিজার্ভ ফরেস্টে ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয়ে জরিপের উদ্যোগ নেয়া হয়নি ।

অনুসন্ধান বলছে, সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্টে বনদস্যুরা গাছ কর্তন করছে খোদ বন বিভাগের নেতৃত্বে। বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. তৌফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে বন বিভাগের একটি সিন্ডিকেট সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট ধ্বংসের সাথে জড়িত বলে স্থানীয় অধিবাসীরা অভিযোগ করেছে।
এই সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা হলেন, বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী সাইফুল ইসলাম ও থানচি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ইসরাইল হোসেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে থানচি রেঞ্জে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ‘জোত পারমিট’ পুনরায় চালু করা হয়েছে। সিন্ডিকেটের পরিকল্পনা অনুযায়ী থানচি রেঞ্জ এলাকা থেকে সাঙ্গু রিজার্ভের গাছ কেটে প্রথমে পাঠানো হচ্ছে বান্দরবান সদর ডিপোতে। সেখানে সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী সাইফুল ইসলাম কাগুজে বৈধতার আড়ালে টিপি বা ট্রানজিট পাস ইস্যু করে সেই কাঠ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করছে।
এ ছাড়া বান্দরবান বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী সাইফুল ইসলাম অবৈধ ইটভাগুলোতে জ্বালানী কাঠ সরবরাহের চুক্তি করেছেন। চলতি বছর ১৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে অবৈধ ইটভাটা মালিকদের সাথে তিনি এই চুক্তি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধান আরও বলছে, বান্দরবানে অবৈধ কাঠ কারবারিদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করছেন কাজী সাইফুল ইসলাম। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তিনি সেগুন কাঠের দরজার পাল্লা, চৌকাঠ, চিরাই কাঠসহ পাড়াবন, প্রাকৃতিক বন ও সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ পাচারের জন্য অলিখিত ‘লাইন’ বা অনুমতি দিয়েছেন। এতে সংরক্ষিত পাহাড়ি বনাঞ্চল উজার হচ্ছে।

সাঙ্গু বনাঞ্চলের আশপাশের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাঙ্গু নদীর দুই পাড়ে একসময় ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো শতবর্ষী গাছ। এখানে রয়েছে প্রায় বিলুপ্ত প্রজাতির গোদা, গর্জন, চম্পা, জারুল, গুটগুটিয়া, চাপালিশ ও গামারসহ নানা প্রজাতির শতবর্ষী গাছ। থানচি থেকে সাঙ্গু নদীপথে তিন্দু, রেমাক্রি, বড় পাথর হয়ে বড় মদক, ছোট মদক, নারিশ্যা ঝিরি, ইয়াংরিং, লিকরি, আন্ধারমানিক, রেমাক্রি ও তিন্দুতে যাওয়ার পথে গাছগুলো একসময় দেখা যেতো। গত কয়েক বছর বন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে গাছগুলো কেটে ফেলেছে সংঘবদ্ধ কাঠ পাচারকারীরা। নিত্যদিন সাঙ্গু ফরেস্টে নানা কৌশলে গাছ কাটা অব্যাহত আছে।
এ ব্যাপারে বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, রিজার্ভ ফরেস্টে গাছ কর্তন হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে বান্দরবান সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী সাইফুল ইসলাম বলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সঠিক নয়।
এনএনবাংলা/
