সৌন্দর্য বিলিয়ে যাচ্ছে মনোমুগ্ধকর ঝুমকো লতা ফুলের গাছ
ঝুমকো জবা বনের দুল, উঠল ফুটে বনের ফুল। সবুজ পাতা ঘোমটা খোলে, ঝুমকো জবা হাওয়ায় দোলে। সেই দুলুনির তালে তালে, মন উড়ে যায় ডালে ডালে। ‘ঝুমকো জবা’নামে এ ছড়াটি এক সময় প্রথম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে অর্ন্তভূক্ত ছিল। ছড়াটি রচনা করেছিলেন জাগরণের কবি ফররুক আহমদ। ছড়াটিতে ‘ঝুমকো জবা’ বা ‘ঝুমকো লতা’ ফুলের বর্ণনা করা হয়েছে। ফুলটি ‘বনের ফুল’ হিসেবেও পরিচিত। এ ফুল গাছটি একটি লতানো গাছ। এটি ঝোপঝাড় ও বনজঙ্গলে বেড়ে ওঠে। লতানো গাছের এ ফুলটি দেখতে অনেকটাই নারীদের কানের অলঙ্কার ঝুমকার মতো। তাই এ ফুলটি ঝুমকো জবা বা জুমকো লতা ফুল নাম অধিক পরিচিত। তবে ফুলটির আরো কিছু নাম রয়েছে। এগুলো হলো-শঙ্খচক্র গদা পদ্মধারী, শঙ্খচক্র, রাধিকা নাচন, পঞ্চপান্ডব, কৃষ্ণকমল, রাখী ফুল, বেগম বাহার প্রভৃতি। ফুলটির ইংরেজি নাম Passion Flowe.আর বৈজ্ঞানিক নাম Passiflora incarnate. বিশ্বে প্রায় অর্ধশত প্রজাতির ঝুমকো লতা ফুল রয়েছে। তবে লতানো এ গাছটি যে শুধুমাত্র নীল রঙের সঙ্গে সাদা আর হালকা ক্রীম রঙের অপূর্ব সংমিশ্রণে দারুন সুন্দর ফুলের জন্য বিখ্যাত তা নয়। এ গাছে এক ধরণের বল আকৃতির গোলাকার ফল হয়। যা প্যাশন ফ্রুটস বা স্থানীয়ভাবে ট্যাং ফল নামে পরিচিত। অম্ল স্বাদের ট্যাং ফল শরবতের জন্য বিখ্যাত। আমাদের দেশে প্যাশন ফ্লাওয়ার ফুলটি খুব একটা প্রচলিত ফুল না হলেও দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ের জাতীয় ফুল হলো এটি। অন্যান্য ফুলের মতো ঝুমকো লতা ফুল নিয়েও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মিথ প্রচলিত ছিল এবং আছে। ভারতের কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র ও উত্তর প্রদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এ ফুলটিতে শ্রীকৃষ্ণ ও পঞ্চপান্ডবের অস্থিত্ব খুঁজে পান। তারা এ ফুলের দিকে তাকিয়ে তারা তাদের দেবতাদের মুখ কল্পনা করতেন। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের খ্রীস্টান মিশনারিরা বিশ্বাস করতেন ঝুমকো লতার গঠন ও বিন্যাসে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কুলাউড়া সড়কের তালতলা বাজারের পাশে রাঙাউটি রিসোর্টে সৌন্দর্য বিলিয়ে যাচ্ছে মনোমুগ্ধকর ঝুমকো লতা ফুলের গাছ। রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ জানান, কয়েক বছর আগে ঝুমকো লতা গাছ স্থানীয় নার্সারী থেকে সংগ্রহ করে রিসোর্টের পূর্বপ্রান্তে রোপন করেছিলেন তারা। গাছগুলোতে প্রতি বছর বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে ফুল ফুটে। লতানো গাছের প্রতিটি পাতার গোড়া থেকে একটি করে ফোটা ফুল দেখলে তনোমন জুড়িয়ে যায়। এ ফুলের কেন্দ্র মধ্যবর্তী স্থানে পাঁচটি করে সবুজাভ হলুদ পরাগধানীর ওপর ডিম্বাশয় থাকে। বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসে ফুল ফোঁটার পর আষাঢ় মাস থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত পর্যন্ত গাছগুলো ভরে যায় ট্যাং ফলে। ফল পাকলে কমলা লাল বর্ণের হয়। ফলটি পাকার পর গাছ থেকে সংগ্রহ করে শরবত হিসেবে খাওয়া যায়।
রাঙাউটি রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ বেলায়েত কামাল জানান, মৌলভীবাজার জেলায় প্যাশন ফ্লাওয়ার বা ঝুমকো লতা ফুল খুব একটা দেখা যায় না। রিসোর্টে রোপনকৃত লতানো এ গাছগুলোতে যখন ফুল ও ফল আসে তখন এখানে আগত পর্যটক ও স্থানীয়রা মুগ্ধ হন। এ রিসোর্টে প্যাশন ফ্লাওয়ার বা ঝুমকো লতা ফুল ছাড়া অসংখ্য দেশি-বিদেশি জাতের ফুল ও ফল গাছ রয়েছে। পুরো রিসোর্ট এলাকাই যেন একটি বিশালাকার গাছের সংগ্রহশালা। প্রয়াত উদ্ভিদবিদ দ্বিজেন শর্মা তাঁর বিভিন্ন লেখায় বর্ণনা করেছেন, ঝুমকো লতা ফুলটির প্রধান সৌন্দর্য্য মাঝখানের প্রায় ৫ সেন্টিমিটার চওড়া পরাগ মুকুট। তাতে অনেকগুলো সরু সরু ডাঁটা, বাইরের ডাঁটার নিচে বেগুনি, মধ্যে সাদা ও আগা নীল থাকে। ঝুমকো লতা ফুলের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা। পরবর্তীকালে উষ্ণমন্ডলীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, চীন ও উত্তর অস্ট্রেলিয়ায় এই গাছের বিস্তৃতি রয়েছে। ঝুমকো লতার ভেষজ গুণ রয়েছে। এই গাছের লতার রস পিঠের ব্যথায় খুব উপকারী। পাতার রস মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করে। এই রস জীবাণুনাশক। কৃমিনাশক হিসেবে এই রস খাওয়া যায়। কাশি, অ্যাজমা, অ্যালার্জিতে এই রস উপকারী। ডায়রিয়া ও আমাশয় রোগে এই রস খাওয়া যায়। এ ছাড়া জুমকা লতার ফুল বেটে মাথার তালুতে লাগালে ভালো ঘুম হয়।
