




বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়ার পাঁচটি সংবাদমাধ্যমে ‘নিয়ন্ত্রণ ও পেশাদারত্ব ফিরিয়ে আনতে’ সরকারি প্রশাসক নিয়োগের আবেদনের এক মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
গত ৮ জুন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিটিআরসি চেয়ারম্যান এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদনটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম সারওয়ার হোসেন। আবেদনটির অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, আইন, স্বরাষ্ট্র, ভূমি ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরেও পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
আবেদনে অভিযোগ করা হয়, বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমগুলো পেশাদারত্ব হারিয়ে ‘মাফিয়াতন্ত্রের হাতিয়ার’ ও ‘দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে’ ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রুপটির বিরুদ্ধে নদী-নালা ও জলাভূমি দখল, আবাসিক এলাকায় চাঁদাবাজি, রাজউকের প্ল্যান জালিয়াতি এবং হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নিয়ে দুবাই, সিঙ্গাপুর, সাইপ্রাস, লন্ডন ও মালয়েশিয়ায় অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এম সারওয়ার হোসেন বলেছিলেন, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণে কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, দ্য ডেইলি সান, নিউজ টোয়েন্টিফোর টিভি এবং বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে সরকারি জমি দখল, আর্থিক অনিয়ম এবং বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সিআইডি তদন্ত করছে।
আইনজীবী সারওয়ার আরও অভিযোগ করেন, নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ ধামাচাপা দিতে বসুন্ধরা গ্রুপ তাদের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করছে। তার ভাষ্য, মানি লন্ডারিং, ধর্ষণ, খুন কিংবা জমি দখলের মতো অভিযোগ নিয়ে কেউ কথা বললেই ওই পাঁচটি সংবাদমাধ্যমে সমন্বিতভাবে অপপ্রচার ও মানহানিকর তথ্য প্রকাশ করা হয়।
মুনিয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, ভুক্তভোগী পরিবারের আইনি লড়াইকেও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর সাংবাদিকদের দায়ী করেননি এম সারওয়ার হোসেন। তার দাবি, তারা চাকরির কারণে বাধ্য হয়ে এসব সংবাদ প্রকাশ করছেন।
প্রশাসক নিয়োগের ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, সংবাদমাধ্যম বন্ধ করার দাবি নয়; বরং এগুলো চালু রেখেই পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসক নিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রেস কাউন্সিলে না গিয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি প্রেস কাউন্সিলকে ‘দন্তহীন সংস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, সংস্থাটির শুধু সতর্ক করার ক্ষমতা রয়েছে, কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার নেই।
এ বিষয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিলে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করা হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।
তবে আবেদন জমা দেওয়ার এক মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বা অগ্রগতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর গত ২৫ জুন জাতীয় সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ও তার ছেলে আনভিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং মুনিয়া ধর্ষণ মামলার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন।
এরপর জাতীয় সংসদে দেওয়া ওই বক্তব্যের পর ২৮ জুন সকাল ৭টা থেকে ১ জুলাই দুপুর ৩টা পর্যন্ত প্রায় ৮০ ঘণ্টায় বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন পাঁচটি সংবাদমাধ্যমে হাসনাত আবদুল্লাহকে নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ, ভিডিও ও ট্রলধর্মী মোট ৯৯টি নেতিবাচক কনটেন্ট প্রকাশ ও প্রচার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে একই প্রতিবেদন অল্প সময়ের ব্যবধানে পাঁচটি মাধ্যমেই প্রকাশ করা হয়েছে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিচালিত ‘শিকারি সাংবাদিকতা’ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জায়গা দখল করছে স্বার্থনির্ভর সাংবাদিকতা।
তাদের অভিমত, অপসাংবাদিকতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে সরকারের উচিত কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, দ্য ডেইলি সান, নিউজ টোয়েন্টিফোর টিভি ও বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোরসহ ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়ার পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে দ্রুত সরকারি প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে সাংবাদিকতার পেশাদার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
এনএনবাংলা/
Tags: ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়াএম সারওয়ার হোসেনপ্রশাসক নিয়োগবসুন্ধরা গ্রুপ
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন