Skip to content

নেতৃত্ব সংকট ও ঋণের বোঝা, নাভানা গ্রুপ কি সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে যাবে?

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ব্যবসায়িক ইতিহাসে ‘নাভানা’ এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যারা একসময় দেশের প্রথমদিকের গাড়ি ব্যবসার পথিকৃৎ ছিল। নাভানা ‘টয়োটা’ ব্র্যান্ডকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিল, সেনাবাহিনীর যানবাহন সরবরাহ করেছে এবং কয়েক দশকের ব্যবসায়িক সাফল্যে তৈরি করেছে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য।

কিন্তু ২০১৯ সালে সবাইকে অবাক করে দিয়ে সরকারের কাছ থেকে প্রায় ১২০০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা চায় ‘নাভানা’ । জানা যায় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি লোন নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

কীভাবে একটি সফল ব্যবসায়িক গ্রুপ এমন আর্থিক সংকটে পড়ল? কোথায় ছিল তাদের ভুল, নাকি এটি ছিল অতিরিক্ত সম্প্রসারণের ফল? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো এই শিল্পগোষ্ঠী কি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

নাভানা গ্রুপের পথচলা

নাভানা গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো এবং পরিচিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। অটোমোবাইল, রিয়েল এস্টেট, নির্মাণ, জ্বালানি, ফার্নিচার, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে বর্তমানে নাভানা গ্রুপকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে স্বাধীনতারও আগের সময়ে, যখন এর ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল ‘ইসলাম গ্রুপ’ নামে। ১৯৬০-এর দশকে বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা খাত তখনো বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। সেই সময়ে উদ্যোক্তা জহুরুল ইসলাম একটি নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ‘ইসলাম গ্রুপ’ নামে পরিচিতি পায়। জহুরুল ইসলামকে বাংলাদেশের আধুনিক নির্মাণ ও অবকাঠামো শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি, বরং দেশের শিল্পায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

টয়োটার সাথে চুক্তি ও প্রসার

নাভানার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ১৯৬৩ সালে। ওই সময় জাপানের বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘টয়োটা’ বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের জন্য ইসলাম গ্রুপের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। এর মাধ্যমে ইসলাম গ্রুপ বাংলাদেশের জন্য টয়োটার আনুষ্ঠানিক পরিবেশক হিসেবে কাজ শুরু করে। তখনকার সময়ে এটি ছিল একটি বড় অর্জন, কারণ বিদেশি গাড়ির বাজার তখনো সীমিত ছিল এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ খুব কম প্রতিষ্ঠানেই পেয়েছিল।

১৯৬৮ সালে জহুরুল ইসলামের ভাই শফিউল ইসলাম কামাল ব্যবসায় যোগ দেন। তার হাত ধরে ব্যবসার পরিধি আরও বিস্তৃত হতে শুরু করে। ইসলাম গ্রুপের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নাভানা লিমিটেড’ এবং ‘আফতাব অটোমোবাইলস’। এই দুটি প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে নাভানা গ্রুপের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময় ও বিভাজন

স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের সময়েও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন যানবাহন আমদানির কাজে যুক্ত হয় ইসলাম গ্রুপ। এর ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই প্রতিষ্ঠানটির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।

তবে নাভানা’র জন্য ১৯৯৬ সালটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও পরিবর্তনের বছর। ওই বছর জহুরুল ইসলামের মৃত্যুর পর ইসলাম গ্রুপের নেতৃত্বে সংকট দেখা দেয়। এরপর তাঁর ভাই শফিউল ইসলাম কামাল পৃথকভাবে ব্যবসা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন এবং নাভানা লিমিটেড ও আফতাব অটোমোবাইলসকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাভানা গ্রুপ’। মূলত সেখান থেকেই আজকের নাভানা গ্রুপের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

নাভানা গ্রুপের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবসা হলো অটোমোবাইল খাত। বর্তমানে নাভানা লিমিটেড এবং নাভানা অটোমোবাইলস বাংলাদেশের টয়োটা গাড়ির প্রধান পরিবেশক হিসেবে কাজ করছে। কয়েক দশকের কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম বড় গাড়ি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক যানবাহন বিভিন্ন ধরণের যানবাহনের বাজারে নাভানার শক্ত অবস্থান রয়েছে। আফতাব অটোমোবাইলস গ্রুপটির গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। এটি দীর্ঘদিন ধরে টয়োটা এবং হিনো ব্র্যান্ডের যানবাহন বাজারজাত করার পাশাপাশি বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং সংযোজনের কাজ করে আসছে। দেশের পরিবহন এবং বাণিজ্যিক যানবাহন খাতে প্রতিষ্ঠানটির অবদান উল্লেখযোগ্য।

অটোমোবাইলের বাইরে রিয়েল এস্টেট খাতেও নাভানার বড় সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘নাভানা রিয়েল এস্টেট’ রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক এবং বাণিজ্যিক প্রকল্প নির্মাণ করে পরিচিতি লাভ করেছে। উচ্চমানের অ্যাপার্টমেন্ট, অফিস ভবন এবং আধুনিক নগরায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি রিয়েল এস্টেট খাতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে।

২০০০ সালে যাত্রা শুরু করে ‘নাভানা ফার্নিচার’। আধুনিক ডিজাইন, আন্তর্জাতিক মানের পণ্য এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থাপনার কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ফার্নিচার ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শহরে নাভানা ফার্নিচারের শোরুম রয়েছে।

২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘নাভানা সিএনজি লিমিটেড’ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। সিএনজি কনভার্শন কিট এবং সিএনজি স্টেশন পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সিএনজি স্টেশন নেটওয়ার্ক বিস্তৃত রয়েছে।

এরপর ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করে ‘নাভানা ইঞ্জিনিয়ারিং’। প্লাস্টিকজাত পণ্য, পাইপ, ডাক্ট এবং শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রকৌশল পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি শিল্প খাতে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে।

ক্রমাগত সম্প্রসারণের মাধ্যমে নাভানা গ্রুপ বর্তমানে দুই ডজনের কাছাকাছি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। অটোমোবাইল, ব্যাটারি, রিয়েল এস্টেট, কনস্ট্রাকশন, টেক্সটাইল, সিএনজি, পেট্রোলিয়াম, প্রকৌশল, ফার্নিচারসহ বিভিন্ন খাতে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত। কয়েক হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রেখে চলেছে।

তবে সাফল্যের পাশাপাশি নাভানা গ্রুপকে ঘিরে বিভিন্ন সময় বিতর্কও তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে টয়োটা গাড়ির একমাত্র পরিবেশক হওয়ার কারণে অনেক ভোক্তা অভিযোগ করেছেন যে, বাজারে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা না থাকায় গাড়ির দাম তুলনামূলক বেশি থাকে। যদিও প্রতিষ্ঠানটির দাবি—আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি শুল্ক এবং পরিচালনা ব্যয়ের কারণে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। সিএনজি খাতেও বিভিন্ন সময় মূল্য নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। কিছু ব্যবসায়ী এবং গ্রাহকের অভিযোগ ছিল বাজারে শক্তিশালী অবস্থানের কারণে নাভানার পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, যা নতুন প্রতিযোগীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে আসছে।

নাভানা ফার্মাস্যাটিক্যাল এর নামে প্রায় ১৩৯ কোটি টাকার কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ ছিল। পেশি শক্তির মাধ্যমে জোরপূর্বক জমি দখলের অভিযোগও আছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে লবিং করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে নাভানা গ্রুপের বিরুদ্ধে। যদিও নাভানা গ্রুপের দায়িত্বশীলরা এই অভিযোগকে বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন।

তবে নাভানা গ্রুপের সবচেয়ে বড় সংকট সামনে আসে ২০১৭ এবং ১৮ সালের দিকে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। নতুন নতুন প্রকল্প, শিল্প উদ্যোগ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে জানা যায়, গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত হারে ব্যবসায়িক আয় না বাড়ার কারণে ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ প্রবাহ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে আর্থিক চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন গ্রুপটির প্রধান উদ্যোক্তা শফিউল ইসলাম কামাল অসুস্থ হয়ে পড়েন। নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক চাপ একসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির উপর বড় প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ব্যবসায়িক মহলে তখন নাভানা গ্রুপের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রতিষ্ঠানটি পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করে। অলাভজনক বা কম লাভজনক কিছু ব্যবসা থেকে সরে আসার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ব্যয় কমানো, ঋণ পুনঃতফসিল করা এবং মূল ব্যবসাগুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে পণ্যের মান উন্নয়ন এবং গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখার দিকেও নজর দেওয়া হয়।

আজও নাভানা গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত ব্যবসায়িক নাম। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই প্রতিষ্ঠান দেশের ব্যবসায়িক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে তাদের সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ থেকে গেছে—ঋণের চাপ কমিয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং পরিবর্তিত বাজার পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা।

একসময় যে প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের অটোমোবাইল খাতে নতুন যুগের সূচনা করেছিল, সেই নাভানা গ্রুপ ভবিষ্যতে আবারও আগের শক্ত অবস্থানে ফিরতে পারবে কি না, সেটি দেখার বিষয়। বাংলাদেশের কর্পোরেট ইতিহাসে তাদের উত্থান যেমন অনুপ্রেরণার গল্প, তেমনি দ্রুত সম্প্রসারণের ঝুঁকি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব না দেওয়া যে বড় ‘ভুল’ এটি ‘নাভানা’ সহ অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকছে।

এনএনবাংলা/