Skip to content

Upcoming
Argentina
0-0
Egypt
Source: ESPN

দেশে গ্যাস সংকটের মাঝেও বছরে ৫ হাজার কোটি টাকার গ্যাস চুরি

ছবি: সংগৃহীত

দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে অবৈধ সংযোগ, চুরি, লিকেজ ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে বছরে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। তবে অনুমোদিত সিস্টেম লস বাদ দিলে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার ১১০ কোটি টাকার গ্যাস চুরি হচ্ছে বলে উঠে এসেছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সাম্প্রতিক এক উচ্চপর্যায়ের সভার কার্যবিবরণীতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস চুরি বন্ধ করা গেলে ঘাটতির বড় একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব হবে এবং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতাও কমবে।

দেশে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের সরকার নির্ধারিত গড় বিক্রয়মূল্য প্রায় ৭০০ টাকা। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট সিস্টেম লস ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এই হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ২৫ কোটি ৩৩ লাখ ঘনফুট গ্যাস হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা। বছর শেষে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ছয় হাজার ৫৭০ কোটি টাকা।

অন্যদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গ্যাস বিতরণে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত সিস্টেম লস অনুমোদন করে। অর্থাৎ বর্তমান ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ সিস্টেম লসের মধ্যে অনুমোদিত অংশ বাদ দিলে অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ মূলত গ্যাস চুরি। এই হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ হাজার ১১০ কোটি টাকা।

সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অধীন পেট্রোবাংলার গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস নিয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সিস্টেম লসের বড় অংশই অনুমোদিত কারিগরি ক্ষতির বাইরে, যা মূলত অবৈধ সংযোগ ও গ্যাস চুরির ফল। একদিকে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে এলএনজি আমদানি করছে, অন্যদিকে প্রতিবছর হাজারো কোটি টাকার গ্যাস চুরি হচ্ছে। এই চুরি বন্ধ করা গেলে গ্যাসের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণে কারিগরি ত্রুটি সর্বোচ্চ ২ শতাংশ হতে পারে। এর বাইরে ৬ থেকে ৭ শতাংশের বেশি যে সিস্টেম লস হচ্ছে, তার পুরোটাই গ্যাস চুরি।

গত ৩০ এপ্রিল জ্বালানি বিভাগে অনুষ্ঠিত আরেক সভায় জানানো হয়, সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী সিস্টেম লস কমানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, বর্তমান অগ্রগতিতে তা অর্জন সম্ভব হবে না। সভায় উপস্থিত জ্বালানি বিভাগের অপারেশন শাখার এক যুগ্ম সচিব জানান, সরকারের লক্ষ্য সিস্টেম লস ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হলেও বর্তমানে তা ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশেই রয়েছে।

সভায় আরও জানানো হয়, একমাত্র গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি (জিটিসিএল) নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে। তবে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি নির্ধারিত ৫ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি, বরং তাদের সিস্টেম লস আরও বেড়েছে। একই ধরনের পরিস্থিতি বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতেও দেখা গেছে।

পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে সভায় জানানো হয়, ওয়াশিং ফ্যাক্টরি ও চুন কারখানাগুলোতে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। শুধু অভিযান চালিয়ে নয়, অবৈধ গ্রাহকদের স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করতে না পারলে সিস্টেম লস কমানো সম্ভব হবে না।

পেট্রোবাংলার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি গ্যাস বিতরণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিস্টেম লস তিতাসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম লস দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

এ বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, বড় শিল্প গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সিস্টেম লস তুলনামূলক কম হলেও অবৈধ সংযোগ, পাইপলাইনের লিকেজ এবং আবাসিক খাতের কারণে ক্ষতি বাড়ছে। নিয়মিত অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে এবং প্রতিবছর লাখ লাখ সংযোগ ও শত শত কিলোমিটার অবৈধ লাইন অপসারণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে আবারও সংযোগ চালু হয়ে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সম্পৃক্ত করে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের ক্ষতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে টেলিভিশন প্রচারচিত্র (টিভিসি) তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া জোনভিত্তিক কর্মকর্তাদের জন্য ‘রিওয়ার্ড অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকারীরা পুরস্কৃত হবেন, আর ব্যর্থদের পদোন্নতি স্থগিত, ইনক্রিমেন্ট বন্ধসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে এলএনজি আমদানিতে সরকারের ভর্তুকিও ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও তা বেড়ে আট হাজার ৯০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি ধরা হয়েছিল ছয় হাজার কোটি টাকা। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি আমদানি করতে হওয়ায় চলতি বছরের শুরুতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

এনএনবাংলা/