Skip to content

Upcoming
Portugal
0-0
Spain
Source: ESPN

খামেনির শেষ বিদায়ে কোরআন তেলাওয়াত দিয়ে বিশ্বকে যে বার্তা দিলো ইরান

তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিনে যখন সৌদি আরবের প্রতিনিধিদল শ্রদ্ধা জানাতে এগিয়ে আসে, তখন নেপথ্যে তিলাওয়াত করা হয় পবিত্র কোরআনের একটি বিশেষ আয়াত। সেই আয়াতই এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দুতে।

তিলাওয়াত করা হয় সুরা আল-ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত, যেখানে ইসলামের ইতিহাসের বিখ্যাত বদর যুদ্ধের কথা উল্লেখ রয়েছে। ওই যুদ্ধে সংখ্যায় ও সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকা মুসলিম বাহিনী আল্লাহর ইচ্ছায় বৃহত্তর বাহিনীকে পরাজিত করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়াতের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে ইরানের ‘বিজয়’ এবং প্রতিরোধের বার্তাই তুলে ধরা হয়েছে।

৬২৪ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান সৌদি আরবের ভূখণ্ডে সংঘটিত বদর যুদ্ধের স্মৃতি সামনে এনে সৌদি প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে এই আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি সৌদি আরবের প্রতি সম্মান, নাকি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক খোঁচা? পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি পরিকল্পিতভাবেই নির্বাচন করা হয়েছিল। একদিকে ইসলামের প্রথম বড় বিজয়ের স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে যুদ্ধ শেষে ইরান আগের চেয়ে আরও শক্ত অবস্থানে রয়েছে—এমন বার্তাও দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষণে আরও বলা হচ্ছে, যুদ্ধ চলাকালে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল এবং কিছু প্রতিবেদনে ইরানে গোপন হামলার অভিযোগও উঠে আসে। সেই প্রেক্ষাপটে বদর যুদ্ধের আয়াতটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইরানের দৃষ্টিতে এটি প্রতিরোধ, টিকে থাকা এবং শক্ত অবস্থান ধরে রাখার প্রতীক।

খামেনির শেষ বিদায়ে বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। এটি প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের প্রত্যাশার বিপরীতে ইরান আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়নি। ৮৬ বছর বয়সী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্য তেহরানে তার বাসভবনে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন। ওই হামলায় তার ১৪ মাস বয়সী নাতনি, জামাতা ও পুত্রবধূও নিহত হন। পরে তার মরদেহ তিন দিন রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের জন্য গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হয়।

ধর্মীয় আয়োজনের আড়ালে রাজনৈতিক বার্তা

পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষ বিদায় অনুষ্ঠানটি শুধু ধর্মীয় নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মঞ্চও ছিল। এর মাধ্যমে ইরান নিজ দেশের জনগণকে রাষ্ট্রের ঐক্যের বার্তা দিয়েছে, মিত্রদের আশ্বস্ত করেছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের উদ্দেশে শক্ত অবস্থানের সংকেত পাঠিয়েছে।

প্রতিরোধ জোটের জন্য ছিল শাহাদাত ও বিজয়ের বার্তা

হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ, হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের হাশদ আল-শাবি এবং আফগানিস্তানের তালেবানের প্রতিনিধিদের জন্য নির্বাচিত আয়াতগুলোর মূল বিষয় ছিল শাহাদাত, আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্য এবং চূড়ান্ত বিজয়।

হামাসকে স্বাগত জানাতে এমন আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যেখানে আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার রক্ষাকারীদের প্রশংসা করা হয়েছে। হিজবুল্লাহর জন্য নির্বাচিত আয়াতে প্রকৃত মুমিনদের বিজয় এবং শাহাদাতের মর্যাদার কথা বলা হয়।

হুথিদের জন্য সুরা আল-ফাতহর ২৯ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যেখানে চাপের মুখেও শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও অগ্রগতির কথা রয়েছে। হাশদ আল-শাবির জন্য সুরা আল-বাকারার সেই পরিচিত আয়াত পাঠ করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে—আল্লাহর পথে নিহতদের মৃত বলা যাবে না।

ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ ও তালেবানের জন্য একই আয়াত—সুরা আল-ফাতহর সূচনা অংশ—নির্বাচন করা হয়, যেখানে ‘স্পষ্ট বিজয়ের’ ঘোষণা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি তেহরানের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দুই পক্ষের অবস্থানকে একই স্তরে তুলে ধরেছে।

রাষ্ট্রীয় মিত্রদের জন্য ছিল শান্ত ও আশ্বাসের বার্তা

রাশিয়া, চীন, ভারত এবং মিসরের (দ্বিতীয় তিলাওয়াত) প্রতিনিধিদের জন্য অপেক্ষাকৃত শান্ত ও আশ্বস্তকারী আয়াত নির্বাচন করা হয়।

রাশিয়ার জন্য এমন আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যেখানে অহংকার ও বিপর্যয় সৃষ্টি না করা মানুষের চূড়ান্ত সফলতার কথা বলা হয়েছে। চীনের জন্য বিজয়কে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সুসংবাদ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

ভারতের ক্ষেত্রে হিজবুল্লাহর জন্য ব্যবহৃত আয়াতের তুলনামূলক নরম অংশ নির্বাচন করা হয়, যেখানে যুদ্ধ বা শাহাদাতের প্রসঙ্গ ছিল না। মিসরের জন্য সৎকর্মশীল মুমিনদের জান্নাতের সুসংবাদের আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এসব রাষ্ট্রকে ইরান কৃতজ্ঞতা ও রাজনৈতিক সমর্থনের বার্তাই দিতে চেয়েছে।

আঞ্চলিক অংশীদারদের জন্য ছিল ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা

কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মিসরের (প্রথম তিলাওয়াত) জন্য নির্বাচিত আয়াতগুলো ছিল সমর্থনের স্বীকৃতি, তবে সশস্ত্র প্রতিরোধ জোটের অংশ হিসেবে নয়।

কাতারের জন্য ‘স্পষ্ট বিজয়ের’ আয়াত তিলাওয়াত করা হলেও তা কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তুরস্কের জন্য এমন আয়াত বেছে নেওয়া হয়, যেখানে সম্পদ ও জীবন দিয়ে সংগ্রামকারীদের মর্যাদার কথা বলা হয়েছে।

পাকিস্তানের জন্য ছিল সম্মানজনক প্রবেশ ও প্রস্থানের দোয়ার আয়াত। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ চলাকালে ইসলামাবাদ ও দোহা কূটনৈতিক যোগাযোগে ভূমিকা রাখায় তাদের প্রতি এই বার্তা দেওয়া হয়েছে। মিসরের প্রথম আয়াতেও ছিল মুত্তাকিদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি।

লেবানন সরকারের প্রতি প্রচ্ছন্ন তিরস্কার

হিজবুল্লাহর জন্য যেখানে প্রশংসাসূচক আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, সেখানে লেবাননের সরকারি প্রতিনিধিদের জন্য সুরা আন-নিসার ৬৬ নম্বর আয়াত নির্বাচন করা হয়। এতে কঠিন নির্দেশ মানতে মানুষের অনীহা ও আনুগত্যের অভাবের কথা উল্লেখ রয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আয়াতের মাধ্যমে ইরান লেবানন সরকারের প্রতি সূক্ষ্ম সমালোচনামূলক বার্তা দিয়েছে। তাদের মতে, ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টিই এই নির্বাচনের মাধ্যমে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এনএনবাংলা/