




মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ শুধু বিশ্বরাজনীতিকেই নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী তেল উৎপাদনকারী জোট ওপেকের (OPEC) দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধও নতুন করে উসকে দিয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উৎপাদন কোটা নিয়ে সদস্য দেশগুলোর দ্বন্দ্ব আরও গভীর হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলার পর্যন্ত নেমে আসতে পারে।
চলতি বসন্তে বিশ্বের অন্যতম বড় তেল সরবরাহ সংকটের মুখোমুখি হওয়ার পর প্রায় ৭০ বছরের পুরোনো ওপেক এখন নিজেদের ঐক্য ও অস্তিত্ব ধরে রাখার কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ধীরে ধীরে সচল হওয়ায় যুদ্ধকালীন ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কয়েকটি সদস্য দেশ দ্রুত তেল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। আর এই চাপই উৎপাদন কোটা নিয়ে পুরোনো বিরোধকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
এই কোটা-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই গত এপ্রিল মাসে ওপেকের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জোট ত্যাগ করে। ফলে এখন ওপেকের সামনে দুটি কঠিন পথ খোলা রয়েছে—জোটের ঐক্য ধরে রাখতে গিয়ে বাজারে অতিরিক্ত তেল সরবরাহের ঝুঁকি নেওয়া, অথবা উচ্চ মুনাফা ধরে রাখতে গিয়ে সদস্যদের মধ্যে বিভাজন আরও বাড়িয়ে তোলা।
সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বসন্তকালে মধ্যপ্রাচ্যে তেলের ঘাটতি না থাকলেও হরমুজ প্রণালি ইরানের অবরোধ এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা অবরোধের কারণে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আটকে যায়। ফলে ইরান, ইরাক ও কুয়েতের মতো ওপেক সদস্য দেশগুলো উৎপাদন কমিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প পায়নি।
এখন হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল হতে শুরু করায় ওপেকের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক ইরাক উৎপাদন কোটা বাড়ানোর দাবি জোরালো করেছে। দেশটির তেলমন্ত্রী ব্লুমবার্গকে জানিয়েছেন, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ানো হলে ওপেকে থাকা না থাকার বিষয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।
যুদ্ধের কারণে ইরাকের তেল উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক ৪৫ লাখ ব্যারেল উৎপাদন এপ্রিল-মে মাসে কমে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। এখন দেশটি দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল উৎপাদনের অনুমতি চাইছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা ৭০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

ছবি: ইন্টারনেট
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে ইরাকের জরুরি ভিত্তিতে রাজস্ব প্রয়োজন। তবে এই পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করছে ওপেকের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য সৌদি আরবের অবস্থানের ওপর।
ইরাক বা কুয়েতের মতো সৌদি আরবের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর তেমন চাপ নেই। কারণ যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালির পরিবর্তে পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে তারা প্রায় ৬০ শতাংশ রপ্তানি সচল রাখতে সক্ষম হয়েছিল। বিপরীতে ইরাক ও কুয়েত পারস্য উপসাগরনির্ভর হওয়ায় একই সুবিধা পায়নি।
এ কারণে সৌদি আরব বৈশ্বিক চাহিদা পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার আগে বাজারে অতিরিক্ত তেল ছাড়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত সরবরাহ বাজারে এলে তেলের দাম এবং মুনাফা—দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়াসহ অন্যান্য নন-ওপেক দেশকে নিয়ে গঠিত ওপেক প্লাস সম্প্রতি দৈনিক মাত্র ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্তে একমত হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক চাহিদার প্রেক্ষাপটে উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেলেও অতিরিক্ত তেলের বড় কোনো ক্রেতা পাওয়া কঠিন হবে।
যুদ্ধের সময় তেলের উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির ব্যবহার কমে যায়, যার প্রভাব এখনো কাটেনি। বিশেষ করে চীন ও ইউরোপে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় তেলের চাহিদা আগের অবস্থায় আর নাও ফিরতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত তেলের মজুদ প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ব্যারেল কমেছে এবং তা পুনরায় পূরণ করা প্রয়োজন, তবে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় বড় আকারের কেনাকাটা ২০২৭ সালের আগে নাও হতে পারে।
সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওপেক যদি উৎপাদন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ায়, তাহলে আগামী বছর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারে নেমে আসতে পারে। ২০২৮ সালের মধ্যে তা ৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। আর পরিস্থিতি আরও জটিল হলে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান উৎপাদন আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারের ঘরে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি সৌদি আরবের মতো আর্থিকভাবে শক্তিশালী দেশ সামাল দিতে পারলেও অধিকাংশ ওপেক সদস্য দেশের জন্য তা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনতে পারে। ফলে বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ সংকটের পর এবার সবচেয়ে বড় তেলের উদ্বৃত্তের ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার।
এনএনবাংলা/
Tags: CNN AnalysisCrude Oil PriceOil Price ForecastOPECওপেকওপেক প্লাস
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন