Skip to content

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিতে কুবিতে শিক্ষক মূল্যায়নের দাবি

‘ভর্তি পরীক্ষার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাস করে ভাবতাম, উনারা যদি এত ভালো ক্লাস নেয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা না জানি আরও কত ভালো ক্লাস নিবেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ক্লাসে গিয়ে পুরোপুরি হতাশ হয়েছি।’

এমনই আক্ষেপের সুরে শিক্ষকদের পাঠদান প্রসঙ্গে নিজের অভিমত ব্যক্ত করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী বায়েজিদ হোসেন।

তিনি জানান, অনেক শিক্ষক বই দেখে দেখে শুধু পড়িয়ে যান। পাঁচটা ছয়টা ক্লাস নিয়ে কোর্স শেষ করিয়ে দেন। সময়মতো ক্লাসে আসেন না। ফলে সময়মতো পরিক্ষায় বসা ও ফলাফল পাওয়া যায় না।

শিক্ষার মান প্রসঙ্গে এটি শুধু বায়েজিদের কথা না। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীর কন্ঠেও ফুটে উঠেছে একই সুর।

শিক্ষকদের একাংশের রুটিন অনুযায়ী ক্লাস না নেওয়া, সময়মতো কোর্স শেষ না করা, নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা ও ফলাফল না দেওয়া, পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া ক্লাস নেওয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। ফলে কয়েকটি বিভাগে সেশনজট ও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত হচ্ছে না মর্মে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এর সমাধান ও শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ‘শিক্ষক পাঠদান মূল্যায়ন’ পদ্ধতি চালু করার দাবি জানাচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থী।

বায়েজিদ যোগ করে বলেন, ‘কিছু শিক্ষক অনেক ভালো পাঠদান প্রদান করেন, আমরা তাদের ক্লাস উপভোগ করি। শিক্ষক পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হলে তারাও মূল্যায়িত হবেন।’

পরীক্ষার আগের রাতে পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করা, পর্যাপ্ত ক্লাস না নিয়েই কোর্স সম্পন্ন করা, কারণ ছাড়াই অনলাইন ক্লাস নেওয়া, ইনকোর্স পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ না করা এবং সেশন জটের বিষয়টি তুলে ধরে গত ২৩ জুন আইন বিভাগে তালা দেন শিক্ষার্থীরা। বায়েজিদের মতে, নিয়মিত শিক্ষক পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি বজায় থাকলে এই ধরনের সংকট তৈরি হবে না।

ইংরেজি বিভাগের একজন শিক্ষার্থী জানান, তার বিভাগে নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে সময়ে পরীক্ষা ও ফলাফল পাওয়া যায় না।

শিক্ষক পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হলে সংকট হ্রাসের পাশাপাশি শিক্ষার মান বাড়বে বলে মনে করেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আদনান সাইফ।

তিনি বলেন, ‘যেহেতু সবার স্কিল এক না। পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু থাকলে শিক্ষার্থীরা কি চায় সেটা সম্পর্কে শিক্ষকরা জানতে পারবেন। ফলে তারা সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারবেন। এতে শিক্ষার মান বাড়বে।’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সুবর্ণা আক্তারের মতে, যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য মানসম্মত শিক্ষা প্রদান, সেহেতু পাঠদান মূল্যায়নের মাধ্যমে একজন শিক্ষক নিজের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করতে পারবেন।

তিনি বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু শিক্ষক রুটিন অনুযায়ী ক্লাস নেন না, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া ক্লাস নেন, সময়মতো কোর্স শেষ করেন না বা পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করতে দেরি করেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে, সেশনজট সৃষ্টি হয় এমনকি শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব সমস্যা দূরীকরণ করার জন্য শিক্ষক পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা অত্যন্ত জরুরি । এ মূল্যায়নের উদ্দেশ্য কোন শিক্ষককে অপমান করা নয় বরং শিক্ষকের শক্তি ও দুর্বলতার দিকগুলো চিহ্নিত করে পাঠদানের মান আরও উন্নত করা।’

ফার্মেসী বিভাগের নাইম ভূইয়া বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রায় সময় অভিযোগ শুনা যায়। অনেক শিক্ষক আছেন যারা উনাদের ক্লাসকে শিক্ষার্থীদের সাথে ভালভাবে কানেক্ট করতে পারেন না এমনকি উনাদের ক্লাসে মান ভালো করার যথেষ্ঠ চেষ্টাও করেন না। আবার কিছু শিক্ষক আছেন যারা ক্লাস ঠিক টাইমে নেন না এবং শিক্ষক হিসেবে উনাদের মৌলিক কাজ গুলো যথাযথভাবে করেন না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি শিক্ষক ইভালুয়েশন ব্যবস্থা চালু করা এবং শিক্ষকদের পড়ানোর মান বাড়ানোর জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।’

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে একাডেমিক ক্যালেন্ডারকে সেশনজটমুক্ত রাখা, যথাসময়ে সেমিস্টার সম্পন্ন করা এবং দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ফারহানা তাসনিম নেহা।

তিনি বলেন, ‘এই উচ্চ শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও ফলপ্রসূ করতে আমরা শিক্ষক পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করার প্রস্তাব করছি। এটিকে আমরা কোনো নেতিবাচক সমালোচনা নয়, বরং একটি বিশ্বমানের ও গঠনমূলক ফিডব্যাক মাধ্যম হিসেবে দেখছি। এর মাধ্যমে শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় হবে। শিক্ষকদের সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখেই এই ইতিবাচক মূল্যায়ন পদ্ধতি আমাদের পাঠদানের মানকে উন্নত করতে এবং একটি আদর্শ উচ্চ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে যৌথভাবে সহায়তা করবে।’

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষক মূল্যায়ন একটি বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া শিক্ষার্থী সহায়ক শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে জবাবদিহিতা নিশ্চিতে এটি একটি কার্যকরী টুল বলে মনে করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক নীতিনির্ধারক ও শিক্ষক।

তাদের মতে, শিক্ষক মূল্যায়ন একটি কোর্সের কার্যকারিতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করতে পারে। এক্ষেত্রে ঐ কোর্সের ভালো দিকগুলির পাশাপাশি উন্নতির ক্ষেত্রগুলিও সনাক্ত করা যায়। এছাড়াও এই পদ্ধতি শিক্ষক কেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থী সহায়ক শিক্ষার দিকে পরিচালিত করবে বলে মনে করেন তারা। এর ফলে পড়াশোনায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এবং অনুপ্রেরণা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষকদের মধ্যে ভালো পাঠদানের মানসিকতা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন তারা।

তবে শিক্ষক পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কিছু প্রতিবন্ধকতা ও সঙ্কট আছে বলে মনে করেন শিক্ষকরা। তবে কেউ কেউ বলেছেন, প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে ধাপে ধাপে প্রতিবন্ধকতা ও সংকট পাশ কাটিয়ে এই পদ্ধতির দিকে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে।

গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোঃ মহিউদ্দিন বলেন, ‘উন্নত দেশে এমনকি দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পদ্ধতি আছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি শুরু হওয়া সময়ের দাবি।’

এই পদ্ধতিতে শিক্ষার মানের পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ডেফিনিটলি এর ফলে শিক্ষার মানের কিছুটা পরিবর্তন আসবে। মূল্যায়ন হবে শিক্ষার্থীদের সন্তুষ্টির উপর ভিত্তি করে। ফলে শিক্ষার্থীদের সন্তুষ্টির জন্য শিক্ষকরা যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে আসবেন। আর এটি যদি পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি নির্দেশক থাকে সেক্ষেত্রে কোন শিক্ষকের মূল্যায়ন যদি কম মানের থাকে তাহলে তার জন্য এটি ডিসক্রেডিট হিসেবে গণ্য হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও সঙ্কট থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন চাইলে ধাপে ধাপে এই পদ্ধতির দিকে এগোতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন বলেন, ‘ছাত্র মূল্যায়নের জন্য যেমন একটি পদ্ধতি আছে মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকতে পারে। তবে এটার মানদণ্ড কিভাবে সেট করা হচ্ছে সেটা দেখতে হবে।’

এই পদ্ধতির মানদণ্ড সেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের একটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড দেওয়া হলো কিন্তু বিভাগে শিক্ষক আছে ৫-৭জন। তাহলে এই মানদণ্ডের সাথে এটাতো মার্চ করতে হবে। ইউজিসির মতে, মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে শিক্ষক লাগবে ২৫ জন। কিন্তু এইখানে আছে ১০ জন। কোনো কোনো বিভাগে আছে ৫জন ৭জন।’

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন ও ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এমদাদুল হক বলেন, ‘শিক্ষক মূল্যায়ন শিক্ষার মান, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির একটি কার্যকর উদ্যোগ।’

সীমাবদ্ধতার ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পাঠদান অনিশ্চিত হয়ে যায় মর্মে তিনি বলেন, ‘কিছু বিভাগে শিক্ষক স্বল্পতা, দক্ষ জনবলের অভাব এবং পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় প্রত্যাশিত মানে পাঠদান করা সম্ভব হয় না।’

তার মতে, শিক্ষক মূল্যায়নের পাশাপাশি পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাসহায়ক সুবিধা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।

আইকিউএসির পরিচালক ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দূর রহমান বলেন, ‘অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার জন্য এই শিক্ষক পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি দরকার। এটা ম্যানুয়ালি আছে। স্টুডেন্ট ফিডব্যাক নিতে হবে। পরবর্তীতে কোর্স কারিকুলাম ইম্প্রুভমেন্ট এবং যিনি কোর্স পড়াচ্ছেন তার টিচিং লার্নিং মেথডকে উন্নতি করার জন্য এই পদ্ধতি দরকার বলে মনে করি।’

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, ‘যেহেতু প্রতিটি বিভাগে ওবিই পদ্ধতিতে পাঠদান শুরু হয়েছে সেহেতু শিক্ষক পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি দ্রুত চালু হবে। ওবিই পদ্ধতির একটি মানদণ্ডই এটি।’