সাম্প্রতিক
বিএনপি চাঁদাবাজ দল—এটা ‘ঢালাও’ অভিযোগ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলা সিনেমার মতো ‘ঘটনা ঘটার পরে পুলিশ এসেছে’: আসিফ মাহমুদ সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর: মূল পরিকল্পনাকারীসহ গ্রেপ্তার ৪ ৫৩৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ: সালমান এফ রহমান-শায়ানসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা ভারতের উত্তর প্রদেশে ভারি বৃষ্টিতে ৫৬ মৃ’ত্যু, ক্ষতিগ্রস্ত হাজারের বেশি বাড়িঘর সংবিধান সংশোধনে আবারও গণভোট হবে: বিশেষ কমিটি ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুলের সঙ্গে আ’লীগের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নারীদের যাতায়াত সুবিধায় সড়কে নামছে আরও ১০০ পিংক বাস আগামী দুই মাসে জাপান, তুরস্ক ও সৌদি আরব সফরের প্রস্তুতি প্রধানমন্ত্রীর রাজধানীতে ৮ মাসে ৭২৩ চাঁদাবাজির মামলা, তদন্তে প্রমাণ মিলেছে ৮৫ শতাংশের
Skip to content

রেহানা হত্যা: চার্জশিটে উঠে এসেছে ভয়াবহতা

রেহানা পারভীন ও আওলাদ হোসাইন

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক রেহানা পারভীন হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পর আদালতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তার দাখিল করা অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) উঠে এসেছে রোমহর্ষক ও লোমহর্ষক বিবরণ।

রেহানা পারভীনকে হত্যার পর রেহানার স্বামী আওলাদ হোসাইন আশুলিয়ায় একটি বাড়ির সামনে সেপটিক ট্যাংকের পাশে রেহানার মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়। পরে ওই জায়গায় লাগানো হয় সবজির চারা।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে স্ত্রী নিখোঁজ বলে প্রচার করে আওলাদ হোসাইন ফিরে যান অস্ট্রেলিয়ায়। স্ত্রীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে মর্মে জাল মৃত্যু সনদ দেন সে দেশের সরকারি দপ্তরে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। সেপ্টেম্বর মাসে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ। আওলাদ হোসাইনও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। তিনি কারাগারে রয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের (এএফপি) তদন্তে উঠে এসেছে, স্ত্রীকে হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে ও তদন্ত প্রভাবিত করতে আওলাদ বাংলাদেশের আমলা, পুলিশ ও স্ত্রীর স্বাভাবিক মৃত্যুর সনদদানকারীকে ৯০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার ঘুষ দিয়েছেন।

রেহানা ২০২৪ সালের ৬ জুন ১৩ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে আসেন। তার স্বামী আওলাদ দেশে আসেন ২৯ জুন। ৩ জুলাই রেহানার সঙ্গে তার মায়ের শেষ কথা হয়। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

রেহানার মা আইরিন আক্তার প্রথমে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে ৮ সেপ্টেম্বর মেয়েকে অপহরণের অভিযোগে আওলাদ হোসাইন, তার দুই বোন পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম এবং আত্মীয় আমজাদ হোসাইনকে আসামি করে মামলা করেন। তবে মামলা হওয়ার আগেই আওলাদ অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৪ জুলাই অসুস্থ রেহানাকে আশুলিয়ায় পাপিয়ার বাড়িতে নিয়ে যান আওলাদ। ৫ জুলাই রাতে স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া হয়। ওই রাতে আওলাদের চাচাতো ভাই কবির ও চাচা আমজাদ হোসেন রেহানার হাত পা চেপে ধরেন। আওলাদ পেটের ওপর উঠে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধে তাঁকে হত্যা করেন। পরে পাপিয়ার বাড়ির সামনে একটি সেপটিক ট্যাংকের পাশে মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়। ১১ জুলাই আওলাদ বড় মেয়েকে দেশে রেখেই গোপনে অস্ট্রেলিয়া চলে যান।

তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান খান বলেন, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত। মূলত পারিবারিক কলহ এবং স্ত্রীর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ছিল। তাঁরা অস্ট্রেলিয়ায় থাকলেও আওলাদ আলাদা থাকতেন। আওলাদের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ায় নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন রেহানা।

পুলিশ ১২ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ায় পাপিয়ার বাড়ির সামনে মাটির নিচ থেকে রেহানার মরদেহ উদ্ধার করে। এরপর অপহরণের মামলাটি হত্যা ও মরদেহ গুমের মামলায় রূপান্তর করা হয়।

তদন্ত শেষে চলতি বছরের ৩১ অগাস্ট নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক তানভীর হাসান খান পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

আসামিরা হলেন—রেহানার স্বামী আওলাদ হোসাইন, তার দুই বোন পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম, চাচাতো ভাই কবীর হোসাইন এবং চাচা আমজাদ হোসাইন।

গত ২১ সেপ্টেম্বর মামলার ধার্য দিনে ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমেদ অভিযোগপত্রটি দেখেন।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রুহুল আমিন জানান, অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য আগামী ১৯ অক্টোবর দিন রেখেছে আদালত।

আসামিদের মধ্যে পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম জামিনে রয়েছেন। কারাগারে রয়েছেন আমজাদ হোসাইন ও কবীর হোসাইন। অভিযোগপত্রে আওলাদকে পলাতক দেখানো হয়েছে।

এ মামলার আসামি পাপিয়া তার জবানবন্দিতে বলেন, দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না। ২০২৪ সালের শুরুতে তার ভাই আওলাদ অস্ট্রেলিয়া থেকে ফোন করে তার খোঁজখবর নেন। পরে বাংলাদেশে এসে তার বাসায় যাওয়ার কথা বলেন। আওলাদ ও রেহানা তার বাড়িতে ৫ জুলাই সন্ধ্যার পর যান। তিনি রান্নাঘরে যাওয়ার পর আমজাদ ও কবীর সেখানে আসেন। পরে ঘর থেকে চিৎকার শুনে তিনি তাদের ঝগড়া থামানোর চেষ্টা করেন।

পাপিয়া বলেন, একপর্যায়ে রেহানা মাটিতে পড়ে যান। আমজাদ ও কবীর তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে যান। কবীর তার দুই হাত এবং আমজাদ দুই পা ধরে রাখেন। আওলাদ তখন রেহানার পেটের ওপর বসে তার মুখে বালিশ চেপে ধরেন। তিনি আওলাদকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারেননি বলে দাবি করেছেন।

রেহানার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ গুম করা হয়। পরে পুলিশ পাপিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মরদেহ উদ্ধার করে।

অন্য আসামি আমজাদ হোসাইন তার জবানবন্দিতে বলেছেন, আওলাদ তাকে পাপিয়ার বাসায় যেতে বলেছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি আওলাদ ও কবীরকে দেখতে পান। রেহানা ও আওলাদের মধ্যে ঝামেলা চলছিল। তার ভাষ্য, তিনি সেখানে মাটি কেটে জায়গা ভরাট করেন।

কবীর তার জবানবন্দিতে বলেন, আওলাদের সঙ্গে রেহানার সম্পর্ক ভালো ছিল না। আওলাদ ঝগড়ার একপর্যায়ে রেহানাকে মেঝেতে ফেলে দেন। আওলাদের কথায় তিনি রেহানার দুই হাত এবং আমজাদ দুই পা ধরে রাখেন। পরে আওলাদ বালিশ চাপা দিয়ে রেহানাকে হত্যা করেন।

রেহানা ও আওলাদের এক মেয়েকেও মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সে অস্ট্রেলিয়ায় তার বাবা-মায়ের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হওয়ার কথা জানিয়েছে।

জবানবন্দিতে মেয়েটি বলেছে, ২০২৪ সালের মে মাসে সে মায়ের সঙ্গে বাংলাদেশে আসে। তখন তার মা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ঈদের পর তারা নবাবগঞ্জে মাকসুদা ফুফুর বাসায় যায়। সেখানে থাকার সময় তার মায়ের রক্তপাত শুরু হয়। সে বাবাকে ডাকতে বললেও ফুফুর সঙ্গে তার মায়ের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে সে ও তার মা রিকশায় করে নবাবগঞ্জ হাসপাতালে যায়। পরে তার মা-বাবা পাপিয়ার বাসায় যান। সেখান থেকে মা ফোনে তাকে বলেছিলেন, তার কিছু হলে তার বাবাকে দায়ী করতে।

এনএনবাংলা/এফএস