সাম্প্রতিক
Skip to content

ইনানীতে ৩২ ঘণ্টায় নেভেনি আগুন,গ্যাসকূপের সম্ভাবনা

ছবিঃ সংগৃহীত

কক্সবাজার জেলার উখিয়া থানাধীন ইনানীতে খননকাজের সময় ভূগর্ভের গ্যাস থেকে লেগে যাওয়া আগুন ৩২ ঘণ্টায়ও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এ কারণে ওই এলাকায় গ্যাস কূপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য খননকাজের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন ৩২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও নেভানো যায়নি। আগুনের শিখা বিদ্যুতের তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে ঘটনাস্থলের চারপাশের ২০০ মিটার এলাকা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের চলাচলে সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।

গ্যাসের উৎস, প্রকৃতি ও আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে আজ সকালে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)’র বিশেষজ্ঞ দল। এর আগে মঙ্গলবার রাতে দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।

পরিদর্শন শেষে বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, নলকূপ খননের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানো হয়েছিল। সেখান থেকে ভূগর্ভের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক চ্যুতির মধ্য দিয়ে গ্যাস ওপরে উঠে নলকূপের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে এসে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, গ্যাসের স্তরের ওপরের অংশ উন্মুক্ত হয়ে গেলে উচ্চচাপের গ্যাস ভূগর্ভের বিভিন্ন ফাটল দিয়ে পথ  তৈরি করে কয়েক দিন পরও ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। গ্যাসের সংস্পর্শে কোনো উৎস থেকে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মানুষের কর্মকাণ্ড কিংবা বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ থেকেও আগুন লেগে থাকতে পারে।

আগুনের রং ও ধোঁয়া পর্যবেক্ষণ করে গ্যাসে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বাপেক্সের এই কর্মকর্তা। তবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত গ্যাসের প্রকৃতি ও উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। একই কারণে গ্যাসের মজুত সম্পর্কেও এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

নাফিফুন আরহাম আরও বলেন, গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করতে বা এর চাপ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এতে ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আপাতত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখাই প্রধান অগ্রাধিকার। গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি জানতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হবে।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করে। আগুন নেভানোর কাজে সেনাবাহিনীও যোগ দেয়। কিন্তু গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। জনবল ও কারিগরি সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হওয়ায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। পরে বাপেক্স, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অবহিত করা হয়।

এ ঘটনায় ওই এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস খনির সন্ধান মিলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কক্সবাজার বেল্টে এর আগে কোনো গ্যাসকূপের সন্ধান মেলেনি। তারপরও নলকূপ বসাতে গিয়ে গ্যাস বের হওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলায় এলাকাবাসীর ধারণা হয়তো সেখানে গ্যাসের কোনো পকেট রয়েছে।

জানা যায়, বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্য খাগড়াছড়ির সেমুতাংয়ে একটি এবং চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড সলিমপুর থেকে সাগরের দিকে ২৫ কিলোমিটার দূরে সাঙ্গু গ্যাস ফিল্ড পাওয়া গিয়েছিল। এই দুটি ছাড়া চট্টগ্রাম বেল্টে আর কোনো গ্যাসক্ষেত্র নেই। বাঁশখালীতে দুটি কূপ খনন করা হলেও সেখানে কোনো গ্যাস পাওয়া যায়নি।

ইনানীতে নলকূপ থেকে আগুনের ঘটনায় বাপেক্সের অনুসন্ধান বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জেবুন নাহার বলেন, ‘বাপেক্সের একটি প্রতিনিধিদল সেখানে গতকাল রাতেই পৌঁছেছে। তারা নমুনা নিয়ে আজ ঢাকা ফিরবেন। নমুনা বাপেক্সের ল্যাবে পরীক্ষার পর বোঝা যাবে সেখানে গ্যাস পাওয়া যাবে কি না। নমুনা পরীক্ষা  আজকালের মধ্যেই শেষ করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘নলকূপ খননে অনেক সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটে। সাধারণত মাটির কম গভীরতায় বায়োজেনিক গ্যাস থাকে। এগুলো মাটির কম গভীরতায় থাকা পকেট গ্যাস।’

জেবুন নাহার বলেন, ‘আমরা যে জোন থেকে গ্যাস তুলি তার গভীরতা কমপক্ষে ২ হাজার ৫০০ মিটার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মিটারের বেশি। কিন্তু এখানে ৮০০ ফিট গভীরতার জোন থেকে গ্যাস উঠছে। ইনানীতে জোনভিত্তিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ করা হয়েছে। কিন্তু খুব গভীর অনুসন্ধান এখানে হয়নি।’

স্থানীয় সূত্র জানায়, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নামে ঢাকার এক ব্যক্তি সম্প্রতি ইনানী গ্রামের ছোট সেতু এলাকায় মোস্তফা সিকদারের বাড়ির কিছু জমি কিনে সেখানে খামার বাড়ি করছিলেন। ওই বাড়িতে নলকূপ বসাতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

নলকূপ খননকারী আবদুল্লাহ বলেন, ‘১০ থেকে ১৫ দিন আগে সেখানে একটি গভীর নলকূপ খনন করা হয়। তবে ৭০০ ফুট গভীরে গিয়েও খাবারের উপযুক্ত পানি পাওয়া যায়নি। পরে গত সোমবার থেকে পাশের আরেকটি জায়গায় নলকূপ বসানোর কাজ শুরু করেন শ্রমিকরা। গতকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে হঠাৎ নলকূপ বসানোর স্থান থেকে আগুন বের হতে শুরু করে। ’

স্থানীয় জালিয়া পালং ইউপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শামশুল আলম বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আগুনের তীব্রতা বাড়ছে। এই এলাকার মাটির নিচে গ্যাসের কোনো পাইপলাইন নেই। ধারণা করা হচ্ছে, এটি প্রাকৃতিক গ্যাস। আগুন জ্বলতে থাকায় স্থানীয় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আশপাশে ঘরবাড়ি কিংবা হোটেল-রিসোর্ট না থাকায় হতাহতের শঙ্কা নেই।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওখানে প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। এ কারণে এলাকাটি নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় এনে বাপেক্সকে খবর দেওয়া হয়। ঢাকা থেকে দুজনের একটি টিম এসে কাজ করছেন।’

এনএনবাংলা/ইএস