সাম্প্রতিক
Skip to content

নীলফামারীতে সাংবাদিক পিতা হত্যা মামলায় যুক্তিতর্কের আগে সাক্ষীদের হত্যার হুমকির অভিযোগ

নীলফামারীতে সাংবাদিকের বাবা মো. জহুরুল ইসলাম হত্যা মামলায় যুক্তিতর্কের আগে সাক্ষীদের হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আসামিপক্ষের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে বিচারিক কার্যক্রম চলার পর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে। মামলাটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও সাক্ষীদের হুমকির ঘটনায় নিহতের পরিবার ও মামলার সাক্ষীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

নিহত জহুরুল ইসলাম হত্যা মামলার সাক্ষী ও দৈনিক দি নিউ নেশন পত্রিকার নীলফামারী প্রতিনিধি মো. আতোয়ার রহমান অভিযোগ করেন, গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে নীলফামারী সদর উপজেলার কুন্দপুকুর ইউনিয়নের আংগারপাড়ায় নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন তিনি। এ সময় বাড়ির সামনে আসামিপক্ষের বাড়ির কাছে পৌঁছালে ১ নম্বর আসামি জসিদুল ওরফে জসি, মুজাহারুল, সাজ্জাদ, সাইনুল, মোস্তাকসহ ৬-৭ জন তাঁর মোটরসাইকেলের সামনে এসে পথরোধ করেন।

আতোয়ার রহমানের দাবি, এ সময় তাঁকে উদ্দেশ করে আসামিপক্ষের লোকজন বলেন, ‘তুই আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিস। তোর বাবাকে মেরেছি, তোকে মারব। একজনকে মারলে যে শাস্তি, চার-পাঁচজনকে মারলেও একই শাস্তি। তোদের পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলব, তোর বংশ নির্বংশ করব। মামলা তুলে না নিলে তোদের রেহাই নেই।’

এ ঘটনায় তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলে জানান আতোয়ার রহমান।

২০১১ সালে হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে মৃত্যু
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২২ জানুয়ারি নীলফামারীতে নিজ বাড়িতে হামলার শিকার হন মো. জহুরুল ইসলাম। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় জসিদুল ওরফে জসিসহ এজাহারনামায় ২২ জন এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, হামলাকারীরা বাড়িতে প্রবেশ করে জহুরুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালান। এ সময় জহুরুল ইসলামের মাথায় কুড়াল, ছোরা ও লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। পরে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ওই হামলায় পরিবারের আরও পাঁচজন আহত হন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ, ২৭ অক্টোবর যুক্তিতর্ক
হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-২-এ বিচারাধীন। মামলা নম্বর এসসি-১২১/২০১২। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারণে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম বিলম্বিত হয়েছে। সর্বশেষ বাদীপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ ও আসামিপক্ষের জেরা সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আগামী ২৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে মামলাটির যুক্তিতর্কের দিন ধার্য রয়েছে। এ পর্যায়ে সাক্ষীদের হত্যার হুমকির অভিযোগ সামনে আসায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, মামলার কয়েকজন আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন। মামলা তুলে না নিলে পরিবারের সদস্য ও সাক্ষীদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি তাঁদের।

বাবার হত্যার বিচার চান মেয়ে
নিহত জহুরুল ইসলামের ছোট মেয়ে ফাতেমা খাতুন বলেন, “আমার বাবাকে আসামি জসিদুল, সাইনুল, মোজাহারুল ও নুরুল হকরা দিনে দুপুরে বাড়িতে ঢুকে হত্যা করেছে। প্রায় ১৫ বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। আমার বাবাকে যারা হত্যা করেছে, তাদের বিচার কবে দেখতে পাব?”

তিনি দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে অপরাধীদের আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

নিহতের পরিবারের সদস্যদের আশঙ্কা, সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হতে পারে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভিন্ন সময়ে আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের কারণে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন। সরকার পরিবর্তন হলেও তাঁরা এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।

তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে। এখন যুক্তিতর্কের আগে সাক্ষীদের হত্যার হুমকির অভিযোগ তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। মামলাটি যেন আবার দীর্ঘসূত্রতায় না পড়ে এবং সাক্ষীরা যেন ভয়ভীতির কারণে বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাবিত না হন, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

আদালতে হুমকির বিষয়টি উপস্থাপনের কথা পিপির
নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-২-এর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) সুফিয়ান নাহার বেগম বলেন, “আগামী ২৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে মামলাটির যুক্তিতর্কের দিন নির্ধারিত আছে। সেদিন আমি আদালতে এ বিষয়টি উপস্থাপন করব।”

ঘটনার পরপরই দি নিউ নেশন-এর নীলফামারী প্রতিনিধি মো. আতোয়ার রহমান মুঠোফোনে নীলফামারী সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জিল্লুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি তাঁকে অবহিত করেন।

এ সময় ওসি তাঁকে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার জন্য লিখিত আবেদন জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, “আপনি আমার বরাবর একটি জিডির আবেদন করুন। আমি বিষয়টি দেখছি।”

এনএনবাংলা/