হরমুজ প্রণালিতে ‘মানবিক করিডোর’ চালুর দাবি ত্রাণ সংস্থাগুলোর
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ মারাত্মক সংকটে পড়েছে।
যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর। এই প্রেক্ষাপটে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সচল রাখতে হরমুজ প্রণালিতে ‘মানবিক করিডোর’ চালুর জোর দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো।
ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) জরুরি বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট বব কিচেন বলেন, হরমুজ প্রণালিতে মানবিক করিডোর নিয়ে জরুরি ও কার্যকর আলোচনা এখন সময়ের দাবি। অন্তত আটকে থাকা জরুরি সহায়তা সামগ্রী যেন দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনেক হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালু রাখতে বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ রাখতে হতে পারে।
উচ্চ তেলের দাম শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেই দুর্বিষহ করছে না, বরং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকেও ব্যাহত করছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পরিচালক সিসিল তেরাজ জানান, তেলের মূল্যবৃদ্ধি তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে যায়। বর্তমানে তা প্রায় ১১১ ডলারে রয়েছে। ফলে জ্বালানি, খাদ্য, সার ও ওষুধের সরবরাহ কমে গেছে এবং ব্যয় বেড়েছে বিশ্বব্যাপী।
সেভ দ্য চিলড্রেনের গ্লোবাল সাপ্লাই ডিরেক্টর উইলেম জুয়েডমা বলেন, একদিকে সহায়তার বাজেট কমছে, অন্যদিকে সংঘাতের কারণে খাদ্য ও ওষুধের প্রতিটি কিটের খরচ বাড়ছে—ফলে দ্বিমুখী চাপে পড়েছে সংস্থাটি।
সংস্থাটির হিসাবে, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার বাড়লে শিপিং, জ্বালানি ও খাদ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ৩ লাখ ৪০ হাজার ডলার খরচ হয়। আর তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি থাকলে চলতি বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার ব্যয় হবে।
ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, বর্তমানে বিশ্বে ৩ কোটি ১৮ লাখ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ নতুন করে চরম খাদ্য সংকটে পড়তে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আগামী মাসগুলোতে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হবে না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
পরিবহন সংকটের ভয়াবহতা বোঝা যায় বিকল্প পথ ব্যবহারের মাধ্যমে। ভারতের মুম্বাই বন্দর থেকে ওমান হয়ে লোহিত সাগর দিয়ে সুদানে যাওয়ার প্রচলিত পথ এখন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় জাহাজগুলোকে কেপ অব গুড হোপ হয়ে ভূমধ্যসাগর ও সুয়েজ খাল দিয়ে ঘুরপথে যেতে হচ্ছে। এতে যাত্রাপথ বেড়েছে প্রায় ৯ হাজার কিলোমিটার এবং সময় লাগছে কয়েক সপ্তাহ বেশি।
আফগানিস্তান, ইয়েমেন ও সোমালিয়ার মতো দেশগুলোতে খাদ্য ও ওষুধের দাম বেড়ে গেছে বহুগুণ। বাংলাদেশে ব্র্যাক জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের কর্মীদের সপ্তাহে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, ফলে শরণার্থী এলাকায় সেবা প্রদানে সময় কমে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মার্সি কোরের নিক জোনস-ব্যানিস্টার। তার মতে, বিশ্বের প্রায় ৪৫ শতাংশ বীজ ও সার হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। সারের ঘাটতি দেখা দিলে কৃষি উৎপাদন কমে যাবে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। এর প্রভাব গৃহযুদ্ধ ও অভিবাসন সংকটেও পড়তে পারে।
এনএনবাংলা/
