তদন্তের জালে খুলনা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল
খুলনা ওয়াসার ২৬শ’ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হতে মরিয়া হয়ে ওঠা নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। রহস্যময় চারটি চেকে প্রায় একশ’ কোটি টাকা লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগে দেশ রুপান্তর পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে মন্ত্রণালয়।
এর আগে পিডি হতে বিভিন্ন দপ্তরে দৌঁড়ঝাপ ও নানামুখি তৎপরতা চালানো প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম নিজেকে সাধু প্রমাণে উঠেপড়ে লেগেছেন। নানান বয়ান তৈরি করে নিজেকে সৎ ও যোগ্য হিসেবে দাঁড় করাতে প্রাণপণ তৎপরতা চলছে তার।
ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী চ্যানেলে খুলনা ওয়াসায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান রেজাউল ইসলাম। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় কুয়েটের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. মো: আলমগীরের ¯েœহভাজন হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পান তিনি। লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়েও ভাইভা ও একাডেমিক রেজাল্ট মূল্যায়নে তাকে এগিয়ে দেওয়া হয়। নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার সাথে নিজেকে আস্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলার ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। তবে বিভাগীয় সদর খুলনায় আওয়ামী জামানায় ক্ষমতার বলয়কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘শেখবাড়ি’র সাথে ওঠাবসা থাকায় শত অনিয়মেও ধরাছোয়ার বাইরে থেকে যান। ওয়াসার যে প্রকল্পেই দায়িত্ব পালন করেন, সেখান থেকেই ওঠে দুর্নীতির অভিযোগ। নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রমাণ দিতে একাধিকবার ইন্সটিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইইবি) নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের প্রার্থী হিসেবে লোকাল কাউন্সিল মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দিতা করেন।
সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পালাবদলের পর অতি দ্রæততার সাথে ভোল পাল্টে নিজেকে জাতীয়তাবাদী ঘরানার হিসেবে প্রমাণের জোর প্রচেষ্টা চালান। বিএনপি ঘরানার ব্যক্তিদের সাথে ওঠাবসা শুরু করেন। কিন্ত শিক্ষাজীবন কিংবা কর্মজীবনে তিনি কখনোই বিএনপিপন্থী ছিলেন না বলে জানিয়েছেন কুয়েট থেকে লেখাপড়া করা একাধিক প্রকৌশলী। এমনকি বিএনপিপন্থী প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স (অ্যাব) এর খুলনা শাখার প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি এ কথার সত্যতা স্বীকার করেছেন।
জানা গেছে, সততা ও যোগ্যতায় পিছিয়ে থাকলেও লবিং ও তদবিরে সুদক্ষ রেজাউল ইসলাম ছাত্র সমন্বয়কদের কাজে লাগিয়ে ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্প-২ এ পিডির রুটিন দায়িত্ব পান। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর খুলনা ওয়াসার ছাত্র প্রতিনিধির সাথে এনসিপি’র কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ওয়াসা ভবনে আসেন। তারা এক প্রকার মব সৃষ্টি করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বাধ্য করেন ফাইল প্রসেস করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে। সেদিনই তার ফাইল অনুমোদন লাভ করে। তবে দায়িত্ব পেলেও তা ধরে রাখতে পারেননি রেজাউল। বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সংগঠন তার নিয়োগে আপত্তি জানিয়ে লিখিত আবেদন করে। চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল তাকে রুটিন দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দিয়ে চিঠি ইস্যূ হয়।

এরপরই সাউথ ইস্ট ব্যাংক খুলনা শাখার চারটি চেকের ফটোকপি ফাঁস হলে শুধু ওয়াসা ভবনেই নয়, গোটা নগরী জুড়ে ব্যাপক চ্যাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। দুটি চেকে ২৪ কোটি করে ৪৮ কোটি টাকা এবং অপর দুটি চেকে ২৩ কোটি করে ৪৬ কোটি টাকার উল্লেখ আছে। প্রায় একশ’ কোটি টাকার এই লেনদেন কার সাথে, চেকে কারো নাম বা তারিখ উল্লেখ নাই। জনৈক নাহিদুল ইসলাম চেকের ফটোকপিতে বুঝিয়া পাইলাম লিখে স্বাক্ষর করেছেন। একাউন্টের মালিক হিসেবে রেজাউল ইসলাম উল্লেখ রয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, এই চেকের মালিক ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। পিডি বানানোর শর্তে এই বিপুল অংকের টাকা হয়তো কোন পক্ষকে দিতে তিনি চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন।
এদিকে রহস্যময় এই চেক নিয়ে মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ হলে বিষয়টি আমলে নেয় মন্ত্রণালয়। ঘটনা তদন্তের জন্য ওয়াসার ব্যবস্থাপন পরিচালককে অনুরোধ করা হয়। গত ২৩ মে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম ফয়সাল স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, খুলনা ওয়াসা নিয়ে উদ্বেগজনক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। যা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই সংবাদে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রতিমন্ত্রী মহোদয় বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন।
এদিকে নিজেকে সৎ ও সাধু সাজানোর প্রচেষ্টা থাকলেও রেজাউল ইসলাম শুরু থেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত ও অসৎ তা উঠে এসেছে বিভিন্ন জনের ভাষ্যে। খুলনা ওয়াসার প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ বলেন, দায়িত্বশীল একটি জায়গায় কাজ করলেও রেজাউল ইসলাম ছিলেন ব্যক্তিগতভাবে লোভী ও স্বার্থপর। বিভিন্ন সময় টেন্ডারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি অহেতুক জটিলতা সৃষ্টি করতেন। পছন্দের ঠিকাদারদের কাজে এস্টিমেট বাড়তি ধরতেন। এমন ফাইল আমার টেবিলে আসলে আমি ফেরৎ পাঠিয়ে সংশোধন করতে বলতাম। কাজ শেষ না হলেও বিল ছাড় করতে চাপ দিতেন। আবার অনেক ঠিকাদার কাজ শেষ করেও বিলের জন্য দিনের পর দিন ঘুরতো। এতে বোঝা যেতো, যাদের সাথে তার সমঝোতা হয়েছে তারা সুবিধা পাচ্ছে, যাদের সাথে হয়নি তারা হয়রানির শিকার হচ্ছে। শোনা যায় তিনি বলছেন, আওয়ামী লীগ না করার কারণে দীর্ঘদিন তার প্রমোশন আটকে আছে। এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা বানোয়াট। তিনি আওয়ামী লীগ করতেন। এবং একাধিকবার আওয়ামী প্যানেল থেকে আইইবি নির্বাচন করেছেন। তার প্রমোশন হয়নি মূলত অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে। যে কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য এ ধরনের কর্মকর্তারা ঝুঁকিপূর্ণ, যোগ করেন তিনি। এ কারণে আমি দায়িত্বে থাকাকালে তার প্রমোশনের জন্য কখনো সুপারিশ করিনি।
অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাব খুলনার সেক্রেটারী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েল জানান, ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম কখনোই জাতীয়তাবাদী ধারার রাজনীতির সাথে ছিলেন না। বরং আইইবি নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদ থেকে প্রার্থী হয়ে তার মতাদর্শের প্রমাণ দিয়েছেন। তার কর্মকান্ড ও তৎপরতা নিয়ে নানা বিতর্ক শোনা যায়।
খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ সাহকে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তদন্তে অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে খুলনা ওয়াসার নব নিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ শাহর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে শুরুতেই তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং বলেন, সাংবাদিক হয়েছেন তো কি হয়েছে, আমি কথা বলবো না। এ কথা বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এমডি যতো সময় ওয়াসায় থাকেন, নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামও পুরোটা সময় এমডি রুমে বসে থাকেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী। এমনকি মাঝেমধ্যে তারা দরজা আটকে একান্তে গোপনীয় কথা বলেন, যখন অন্যদের এমডির রুমে প্রবেশ নিষেধ।
