আজিজ খানসহ সামিটের ৭ পরিচালকের বিরুদ্ধে এনবিআরের মামলা

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার লিমিটেড এবং সিঙ্গাপুরের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের আজিজ খান পরিবারের বিরুদ্ধে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকির গুরুতর অভিযোগ তুলেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে ফাঁকি দেওয়া কর আদায় নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামিট পাওয়ারের সাত পরিচালকের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজস্ব বোর্ড।
এনবিআরের অভ্যন্তরীণ নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে রাজস্ব বোর্ডের আইনি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মোট ২০টি রিট করেছে সামিট গ্রুপ। এসব রিটের কয়েকটি এখনো অমীমাংসিত। তবে নতুন আয়কর আইনের বিধান অনুসরণ করে এবার বিষয়টিকে শুধু দেওয়ানি বিরোধ হিসেবে না দেখে অপরাধের দায়ে পরিচালকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর।
অভিযুক্ত সাত পরিচালক হলেন—মোহাম্মদ আজিজ খান, আঞ্জুমান আজিজ খান, আদিবা আজিজ খান, মোহাম্মদ ফয়সাল করিম খান, মোহাম্মদ লতিফ খান, মোহাম্মদ ফরিদ খান এবং জাফর উমেদ খান। এনবিআরের নথি অনুযায়ী, তারা মূলত আজিজ খান পরিবারের সদস্য।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম প্রধান কোম্পানি সামিট পাওয়ার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের এক ডজনের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী কোম্পানি রয়েছে। সামিট পাওয়ারের ৬৩ দশমিক ১৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক মূল প্রতিষ্ঠান সামিট করপোরেশন। ফলে সামিট পাওয়ারের বার্ষিক মুনাফার ৬৩ দশমিক ১৯ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে সামিট করপোরেশনের হিসাবে জমা হয়।
অন্যদিকে, সামিট করপোরেশনের প্রায় ৯৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল। ফলে সামিট করপোরেশনের আয়ের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে অবস্থিত সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালে স্থানান্তরিত হয়। এনবিআরের অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, সামিট পাওয়ার থেকে সামিট করপোরেশনে লভ্যাংশ পরিশোধের সময় বড় অঙ্কের উৎসে কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, আয়কর আইনের ১৪৩(৫) ধারায় একটি কোম্পানি অন্য কোনো কোম্পানিকে ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ দেওয়ার সময় ২০ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে সামিট পাওয়ার কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানির উপার্জিত আয় শতভাগ করমুক্ত। তাই লভ্যাংশ হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও উৎসে করের বাধ্যবাধকতা তাদের ওপর প্রযোজ্য নয়।
এনবিআরের প্রাথমিক দাবির বিরুদ্ধে গত বছর উচ্চ আদালতে রিট করে সামিট। সাধারণত এ ধরনের করসংক্রান্ত বিরোধ দেওয়ানি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা হয়ে থাকে। তবে গত জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর আয়কর আইনে পরিবর্তন আনা হয়। নতুন বিধানে নথি জালিয়াতি কিংবা মিথ্যা বা ভুল তথ্য দিয়ে কর ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেলে সরাসরি ফৌজদারি মামলা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সেই বিধানের ভিত্তিতেই সামিটের সাত পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছে এনবিআর।
এনবিআর ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বড় ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে সামিট পাওয়ার ও এর পরিচালনা পর্ষদের অনিয়মও খতিয়ে দেখে সিআইসি।
এর আগে ২০২৩ সালে এনবিআরের কর অঞ্চল-১ থেকে সামিট পাওয়ারের ডিভিডেন্ডের ওপর ২০ শতাংশ উৎসে করের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছিল। তবে তৎকালীন ব্যাখ্যার কারণে বিষয়টি আর এগোয়নি। সম্প্রতি তদন্ত পুনরায় শুরু করে এনবিআর জানিয়েছে, সামিটের ওই ডিভিডেন্ডের ওপর ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রযোজ্য।
এনবিআরের নথিতে দেখা যায়, ডিভিডেন্ডের ওপর উৎসে কর ফাঁকির পরিমাণ ৯৬৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সামিট পাওয়ার লিমিটেড সাত বছরে ৩৮৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, সামিট গাজীপুর-২ লিমিটেড ১৭৬ কোটি ৫৭ লাখ, সামিট বরিশাল পাওয়ার ৫৬ কোটি ২৬ লাখ, সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার ৯২ কোটি ৮০ লাখ, সামিট নারায়ণগঞ্জ পাওয়ার ইউনিট-২ ২০ কোটি ৯ লাখ, সামিট এলএনজি টার্মিনাল ১০০ কোটি ৬০ লাখ এবং সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার ১২৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা উৎসে কর ফাঁকি দিয়েছে বলে দাবি করেছে এনবিআর।
এ ছাড়া আয় গোপনের অভিযোগে পৃথক তিনটি নথিতে সামিট মেঘনাঘাট, সামিট বিবিয়ানা ও সামিট বরিশাল পাওয়ারের আরও ১ হাজার ১৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে ডিভিডেন্ডের উৎসে কর ও আয় গোপনের অভিযোগ মিলিয়ে মোট ফাঁকির অঙ্ক দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে এনবিআরের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সামিট করপোরেশনের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহসেনা হাসান বলেন, সামিট গ্রুপ সবসময় দেশের প্রচলিত আইন ও বিধি মেনে সঠিক নিয়মে রাজস্ব পরিশোধ করে আসছে। করপোরেট স্বচ্ছতা ও আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কেপিএমজি ও বেকার টিলির মতো আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত রাখা হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন থাকায় এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
এনএনবাংলা/

