মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন

প্রায় ৩৫ বছর পর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫টি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন ক্ষমতাসীন বিএনপি মনোনীত এই প্রার্থী। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, যিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন।
বিএনপির মহাসচিব এবং সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। ছাত্র রাজনীতি দিয়ে পথচলা শুরু করে শিক্ষকতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেরিয়ে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বসতে যাচ্ছেন তিনি।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলটির মনোনয়নে নির্বাচিত ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দেড় বছর আগেই গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। এরপর চলতি মাসের শুরুতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের পর আগামী পাঁচ বছরের জন্য বঙ্গভবনের বাসিন্দা হবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ছাত্র রাজনীতি দিয়ে শুরু
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্রজীবনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ষাটের দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন। ওই সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে কারাগারেও যেতে হয়েছিল।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এরপর দেশের বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন।
তবে শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ থেকেই যায়। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে সে সময়ের উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে যোগ দেন তিনি।
জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ, পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত
কয়েক বছর পর ১৯৮৬ সালে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। এর দুই বছর পর ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।
এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শামছুল আলমের ভাষ্য, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মির্জা ফখরুল সদালাপী, বিনয়ী ও পরিশ্রমী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নিঃস্বার্থ রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি সবার কাছে সমাদৃত।
১৯৯১ সালে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও প্রথমবার জয় পাননি তিনি। পরে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
প্রতিমন্ত্রী থেকে মন্ত্রিসভায়
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা হলে তাকে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার আগে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, মেয়র, প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে প্রচলিত নানা নেতিবাচক অভিযোগ বা ভাবমূর্তি তৈরি হয়নি।
বিএনপির কঠিন সময়ে নেতৃত্ব
২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিএনপির জন্য সময়টি ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলের শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি হন। একই সময়ে দল ভাঙনের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলেও বিএনপি রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই কোণঠাসা অবস্থায় ছিল। এই কঠিন সময়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি হয়। ওই নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি তিনি।
এরপর ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালে দলের তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা গেলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন।
২০১১ সালেই আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়। এরপর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রতিবাদে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি এবং আন্দোলনে নামে।
এ সময় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই গ্রেপ্তার, মামলা ও দমন-পীড়নের মুখে পড়েন। এর প্রায় দুই বছর পর, ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
খালেদা জিয়া কারাবন্দি, তারেক রহমান লন্ডনে—দেশে দলের নেতৃত্বে ফখরুল
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দি হন। একই বছরের জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ও মামলাজনিত নানা সংকটে পড়ে বিএনপি।
একদিকে খালেদা জিয়ার বন্দিজীবন, অন্যদিকে দলের তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডনে অবস্থান—এমন পরিস্থিতিতে দেশের ভেতরে বিএনপির নেতৃত্ব দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপি ভেঙে পড়েনি। এর পেছনে দেশের ভেতর থেকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
দলের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে একাধিক মামলায় তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলা ও নির্যাতনেরও মুখে পড়েছেন তিনি।
‘ক্লিন ইমেজের’ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলীয় প্রতিপক্ষকে আক্রমণাত্মক ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। তবে এ ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অনেকটাই ব্যতিক্রমী হিসেবে দেখা হয়।
অধ্যাপক শামছুল আলম বলেন, মির্জা ফখরুলের রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তার নম্রতা, বিনয় ও সদালাপী আচরণ। অন্য দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি কটূক্তি করতেন না; বরং সবাইকে সম্মান দিয়ে কথা বলতেন।
এ কারণেই শুধু বিএনপির ভেতর নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের কাছেও একজন সজ্জন রাজনীতিক হিসেবে মির্জা ফখরুলের আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
মহিউদ্দিন আহমদের মতে, রাষ্ট্রপতির পদ একটি সম্মানজনক সাংবিধানিক পদ এবং মির্জা ফখরুলের জন্য এটি প্রাপ্য ছিল। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে উঠে রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে হবে।
জন্ম, শিক্ষা ও পরিবার
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী। মা মির্জা ফাতেমা আমিন ছিলেন গৃহিণী।
মির্জা রুহুল আমিন পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার দুইবারের সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। তিনি এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে অবসর নিয়েছেন।
এই দম্পতির দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে সেখানেই শিক্ষকতা করেন এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। বড় ভাইয়ের মতো তিনিও ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র ছিলেন।
রাজনীতির পাশাপাশি ছাত্রজীবনে নাট্যচর্চার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নাট্যমঞ্চে অভিনয় করেছেন তিনি। পাশাপাশি আবৃত্তিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিয়েছেন।
ছাত্র রাজনীতি থেকে শিক্ষকতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
(প্রতিবেদনটি বিবিসি বাংলা থেকে নেওয়া)
এনএনবাংলা/

