বড়োলোক-গরিব ভেদে কবরের জমির মূল্য কত?

ঢাকা শহরে আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে আপনার বা আপনার প্রিয়জনের কবরের জায়গা। তাই মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষ ইচ্ছা করলেই যেকোন জায়গায় কবর দিতে পারবেন না বা বছরের পর বছর কবর সংরক্ষণ করতে পারবেন না।
ঢাকার মতো শহরে জমির দাম অনেক বেশি। শহর যে অনুপাতে বেড়েছে, সে অনুপাতে পরিকল্পনার অভাবে কবরস্থানের জন্য জায়গা নির্দিষ্ট নেই। এখানে আবেগের কোন মূল্য নেই। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় পরিজন মারা গেলে গ্রামের বাড়িতে কবর দিতে ছোটেন ঢাকায় বসবাসকারী মানুষেরা।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বসবাস করেন প্রায় আড়াই কোটি মানুষ। সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দাদের দাফন হয় নির্ধারিত কবরস্থানে।
ঢাকার দুই সিটিতে সরকারি কবরস্থানগুলোতে কবর হয় দুই ধরনের–সাধারণ ও সংরক্ষিত। এর মধ্যে সাধারণ কবর ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পরপর নতুন করে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ একই কবরে নতুন লাশ দাফন করা হয়।
অঞ্চলভেদে রাজধানী ঢাকায় একটি কবরের দাম সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা। তবে এই কবর শুধু টাকা থাকলেই পাওয়া যাবে না, উচ্চপর্যায়ের তদবিরও লাগবে। মাসে ৫০ হাজার টাকা হারে কবর ভাড়া করলেও শেষ পর্যন্ত একই কবরে দাফন করা হবে অন্য কাউকে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার বনানী কবরস্থানে সাধারণ জায়গায় ২৫ বছরের জন্য প্রিয়জনের কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে দিতে হবে সাড়ে ৪ কোটি টাকা। এখানে এক-তৃতীয়াংশের বেশি কবর সংরক্ষিত। ফলে সাধারণের কবর দেওয়ার সুযোগ কম। একটি কবরের ১৮ মাস থেকে দুই বছর পার হলেই সেখানে নতুন করে কবর দেওয়া হয়। সংরক্ষিত কবর নির্দিষ্ট মেয়াদে সংরক্ষণের এই সুযোগ শুধু বিত্তবানদের জন্য প্রযোজ্য।
যদি কেউ তার প্রিয়জনের কবর ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে চায় তাহলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০ লাখ টাকা দিতে হয়। আর উত্তর সিটি করপোরেশনের বনানী কবরস্থানে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত দিতে হয়!
বনানী কবরস্থানে মূলত দুটি ভাগ। একটি সংরক্ষিত এলাকা আরেকটি সাধারণ। ডিএনসিসির কবরস্থান নীতিমালা ২০২২-অনুযায়ী সংরক্ষিত এলাকায় ২৫ বছরের জন্য একটি কবর সংরক্ষণে গুনতে হয় দেড় কোটি টাকা। সাধারণ এলাকায় এ ফি তিন গুণ বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ৪ কোটি টাকায়।
এ ধরণের নিয়মের ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে ঢাকায় প্রিয়জনের কবর সংরক্ষণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালেও বিত্তবানদের জন্য এটা তেমন কোনো সমস্যা না।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ছয়টি কবরস্থানে নির্ধারিত মেয়াদে কবর সংরক্ষণের জন্য গুনতে হয় কয়েক লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত।
‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কবরস্থানগুলোর নীতিমালা-২০২২’ অনুযায়ী, ১৫ ও ২৫ বছর মেয়াদে কবর সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফি বনানী কবরস্থানে।
সেখানে ১৫ বছরের জন্য ১ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য দেড় কোটি টাকা দিতে হয়।
উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য ৭৫ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ১ কোটি টাকা লাগে।
উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে যথাক্রমে ৫০ লাখ ও ৭৫ লাখ টাকা; উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ টাকা; মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ২০ লাখ ও ৩০ লাখ টাকা এবং রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধসংলগ্ন কবরস্থানে ১০ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা দিতে হয়।
অর্থাৎ ডিএনসিসির কবরস্থানগুলোর মধ্যে ১৫ বছরের সংরক্ষণ ফি ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের ফি ১৫ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকার মধ্যে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন আজিমপুর, জুরাইন ও খিলগাঁও কবরস্থানেও মেয়াদ বাড়াতে বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়।
এই তিনটি কবরস্থানেই ১০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত কবর সংরক্ষণের অভিন্ন নিয়ম রয়েছে।
যে কোনো কবরস্থানে ১০ বছর মেয়াদে সংরক্ষণের ফি পাঁচ লাখ টাকা, ১৫ বছর মেয়াদে সংরক্ষণের ফি ১০ লাখ টাকা, ২০ বছর মেয়াদে সংরক্ষণের ফি ১৫ লাখ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৫ বছর মেয়াদে সংরক্ষণের ফি ২০ লাখ টাকা।
ডিএনসিসির কবরস্থান ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী, সাধারণ এলাকায় দাফন করা কবর সংরক্ষিত কবর হিসেবে রাখা হয় না; নির্ধারিত সময় পর ওই স্থান পুনরায় দাফনের জন্য ব্যবহার করা হয়।
তবে বিশেষ ব্যক্তিদের কবর সংরক্ষণের জন্য ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, সরকারের নির্দেশ বা মেয়রের অভিপ্রায় অনুযায়ী ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বরেণ্য ব্যক্তির’ কবর সাধারণ এলাকায় হলেও সংরক্ষণ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে সংরক্ষিত এলাকার জন্য নির্ধারিত ফির তিন গুণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
ফলে সাধারণ এলাকার কবর যেখানে নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় দাফনের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা, সেখানে নীতিমালার বিশেষ বিধানের আওতায় ‘বরেণ্য’ ব্যক্তির কবর অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা সম্ভব।
এছাড়া, সংরক্ষিত কবরে পরিবারের অন্য সদস্যের মৃতদেহ পুনরায় দাফন বা পুনঃকবরের ক্ষেত্রেও মোটা অঙ্কের ফি দিতে হয়।
ডিএনসিসিতে বনানী কবরস্থানের ক্ষেত্রে পুনঃকবর রেজিস্ট্রেশন ফি ৫০ হাজার ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য কবরস্থানের জন্য ৩০ হাজার ৫০০ টাকা।
ডিএসসিসির কবরস্থান ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২০ অনুসারে, প্রতিটি সংরক্ষিত কবরে পুনঃকবরের ফি ৫০ হাজার টাকা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নীতিমালা অনুসারে, মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত বিশেষ এলাকায় খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে মুক্তিযোদ্ধার পরিবার তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের যে কোনো কবরস্থানে কবর সংরক্ষণ করতে পারবে।
মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের বর্ধিত অংশের ১.৫ একর জায়গা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত সাধারণ কবরে দাফনের ক্ষেত্রে প্রমাণক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত তালিকায় নাম থাকতে হবে এবং যথাযথ সনদ দাখিল করে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।
মিরপুরে আবেদনের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রথম ১০ বছর ফি ছাড়া কবর সংরক্ষণের পর পরবর্তী সময়ের জন্য নির্ধারিত হারে ফি প্রযোজ্য হবে।
তবে রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন কবরস্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের কবর আজীবন সংরক্ষিত থাকবে।
ঢাকার কবরস্থানগুলোতে সাধারণ কবরগুলো দুই বছর সংরক্ষণ করার নিয়ম। তবে অনেক সময় ব্যতিক্রম হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বললেন, “ঢাকা শহরে সীমিত জায়গা, ঢাকায় সবাই যদি কবর চিরস্থায়ী করতে চান, তাহলে নতুন মানুষকে দাফন করার জায়গা থাকবে না। দুই বছর পর কবরগুলোকে আমরা ‘চালা’ করে ফেলি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু কবর হওয়ার পর, আত্মীয়স্বজন আর খোঁজ নেন না কিংবা অনেক ক্ষেত্রে খোঁজ নেওয়ার মত আত্মীয়স্বজন থাকেও না। সে কবরগুলো অনেকসময় ভুলবশত আগেই চালা করে ফেলা হয়। হয়ত এক বছর পর হল, কিংবা কিছু ক্ষেত্রে অনেকসময় ৬ মাস পরেও হয়।”
এনএনবাংলা/এফএস

