‘খণ্ডিত সংস্কার’ মানবে না বিরোধী দল, ‘ক্ষোভ উগরে’ সংসদে ওয়াকআউট

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলোর কয়েকটির কার্যকারিতা হারানো এবং পৃথক পৃথক বিল আনার প্রতিবাদে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, তারা কোনো ‘খণ্ডিত’ সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হতে চান না। পূর্ণাঙ্গ সংস্কার এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে তাদের অবস্থান অব্যাহত থাকবে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত ৮টা ৬ মিনিটের দিকে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। পরে সংসদ ভবনের সামনে সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন তারা।
এর আগে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর আইন প্রণয়ন কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের সমালোচনা করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, বৃহত্তর স্বার্থে তারা পূর্ণাঙ্গ সংস্কার চান এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে সরে আসবেন না। তার ভাষায়, ‘খণ্ডিত কোনো প্রক্রিয়ার অংশ’ হতে না চাওয়ায় তারা ওই পর্যায়ে সংসদীয় আলোচনায় আর অংশ নেবেন না।
তিনি বলেন, “এই পর্বে আমরা সংসদ থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমরা আবার ওয়াকআউট করছি। আমরা আবার যখন উপযুক্ত, তখন ইনশাআল্লাহ আমরা আসব, অংশগ্রহণ করব, জনগণের পক্ষে কথা বলব।”
বিশেষ অধিবেশন না ডাকায় ক্ষোভ
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের দাবিতে আগে দেওয়া চিঠির বিষয়টিও সংসদে তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি জানান, এ বিষয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পাশাপাশি স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীকে চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছিল। তবে কোনো জবাব পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে আলোচনা করার জন্য সংসদের বিশেষ অধিবেশন প্রয়োজন ছিল। তার অভিযোগ, মানুষ একদিকে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে রয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিল নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
জ্বালানি সংকটে কত কারখানা বন্ধ হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ ৭০০, কেউ ৯০০ আবার কেউ ৯৫টি কারখানা বন্ধ হওয়ার কথা বলছেন। তবে সংখ্যা যাই হোক, বিপুলসংখ্যক কারখানা জ্বালানি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘চব্বিশের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সংসদ’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে গতানুগতিক সংসদ হিসেবে দেখতে চান না বলেও মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তার ভাষ্য, এই সংসদ ভিন্নধর্মী এবং ‘চব্বিশের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সংসদ’।
তিনি বলেন, সংসদের শুরু থেকেই দেশের জন্য নতুনভাবে কাজ করার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার পরও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
বিরোধীদলীয় নেতার দাবি, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিলেন। সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষই গণভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিল। কিন্তু গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিরোধ
সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকাকে কেন্দ্র করে সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই বিরোধী দল আপত্তি জানিয়ে আসছে। গত ১৫ মার্চ এ বিষয়ে সংসদে প্রশ্ন তোলেন শফিকুর রহমান। পরে ৩১ মার্চ তার মুলতবি প্রস্তাবের ওপর প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনা হয়। পরদিন ‘প্রতিকার না পাওয়ার’ অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।
পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাসের দিনও বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল।
শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান ‘সংশোধন’ করার জন্য নয়, গণভোটের রায় অনুযায়ী ‘সংস্কার পরিষদ’ গঠনের পক্ষেই তাদের অবস্থান।
১৩৩ অধ্যাদেশের প্রসঙ্গ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের প্রসঙ্গও সংসদে তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় নেতা। তার অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংস্কারমূলক অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন ও নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের সংস্কারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানান।
সংসদের বিশেষ কমিটি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধন করে আইনে পরিণত করার সুপারিশ করেছিল। আরও ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই করে নতুন বিল হিসেবে আনার এবং সাতটি অধ্যাদেশ রহিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
১০ এপ্রিল পর্যন্ত ছয় দিনে ৯১টি বিল পাসের মাধ্যমে মোট ১২০টি অধ্যাদেশের সাংবিধানিক নিষ্পত্তি করে সংসদ। এর মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোর পথে যায়। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশও এর মধ্যে ছিল।
মানবাধিকার কমিশন বিলেও আপত্তি
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নতুন বিল উত্থাপনের বিরোধিতা করেও বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। তিনি আগের অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়টি সামনে আনেন।
গত ৯ এপ্রিল বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনরায় কার্যকর করার বিল পাস হয়। তখন সরকার জানিয়েছিল, আরও যাচাই-বাছাই করে মানবাধিকার কমিশনের জন্য শক্তিশালী আইন করা হবে।
পরে ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভা নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া অনুমোদন করে।
গুমবিরোধী আইন নিয়েও বিরোধ
বৃহস্পতিবার সংসদে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলও উত্থাপনের কার্যসূচিতে ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের আগস্টে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে অধ্যাদেশের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়। পরে ওই বছরের ডিসেম্বরে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশ করা হয়।
ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার পর অধ্যাদেশটি সরাসরি আইনে পরিণত হয়নি। গত ৫ এপ্রিল জামায়াতের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিনকাসেম আরমান অধ্যাদেশটি আগে আইনে পরিণত করে পরে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের দাবি জানিয়েছিলেন। আইনমন্ত্রী তখন আরও যাচাই করে ‘যুগোপযোগী’ বিল আনার আশ্বাস দেন।
বেসরকারি দিবসে সরকারি বিল নিয়েও প্রশ্ন
বৃহস্পতিবার সরকারি বিল উত্থাপন নিয়েও আপত্তি জানান শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সংসদের সমঝোতা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার বেসরকারি সদস্যদের দিবস। এদিন সরকারি বিল উত্থাপন করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তার অভিযোগ, বেসরকারি সদস্যদের বেশ কিছু বিল অপেক্ষমাণ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো বিবেচনায় না নিয়ে সরকারি বিল উত্থাপন করায় সংসদ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের অংশ না নেওয়ার কারণ
সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের অংশ না নেওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, সংসদের ভেতরে ও বাইরে তাদের বারবার কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে বিরোধী দল সংবিধান ‘সংশোধন’ নয়, গণভোটের রায় অনুযায়ী ‘সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে।
সরকার গত ২৯ এপ্রিল সংবিধান সংশোধনে ১৭ সদস্যের বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়। বিরোধী দল তখন ‘ধারণাগত পার্থক্যের’ কথা বলে কমিটিতে নাম দেওয়া থেকে বিরত থাকে। পরে ১৩ জুলাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাসের সময় গণভোটের রায় ‘বাইপাস’ করার অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে তারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির প্রথম বৈঠক হয় ৪ আগস্ট। ওই বৈঠকেও বিরোধী দল অংশ নেয়নি।
‘মূল সংস্কারের দাবি চাপা দেওয়া হচ্ছে’
বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন বিল এনে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের মূল দাবিকে আড়াল করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, “এইসব কিছুতে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সংসদকে ঠেলে একতরফাভাবে, একপেশে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।”
তার আশঙ্কা, এভাবে এগোলে সংস্কারের মূল দাবি চাপা পড়ে যাবে। এ ধরনের প্রক্রিয়াকে তারা সমর্থন করেন না বলেও জানান তিনি।
পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে শফিকুর রহমানের ওয়াকআউট ঘোষণার মধ্য দিয়ে সংসদ থেকে বেরিয়ে যান বিরোধী দলের সদস্যরা।
এনএনবাংলা/

