তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি: সংবিধান কমিটির সভাপতি

তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠিত হবে এবং কারা এতে থাকবেন, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছ থেকে প্রস্তাব চেয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন
বৈঠকে টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি, সম্পাদক, সাংবাদিক এবং টকশোর আলোচকেরা সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত দেন। আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতিও উঠে আসে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া নিয়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন। জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে কিছু প্রস্তাব রয়েছে। তবে সরকার গঠনের ধাপ এবং সম্ভাব্য বিকল্পগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। শেষ পর্যন্ত সংসদই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
কমিটির মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদেরও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে লিখিত প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে।
চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে কার্যকর হওয়ার কথা
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা করে গত বছরের ২৫ নভেম্বর নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত দেয় সর্বোচ্চ আদালত। আদালতের রায় অনুযায়ী, চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এ ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার কথা।
সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের পর রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মনোনয়নের পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়নি।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ নিয়েও মতভেদ
বৈঠকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে এবং সরকার সে অনুযায়ী এগোতে চায়। তবে বৈঠকে কয়েকজন এ ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছেন।
তাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশের মতো একক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজন আছে কি না। পাশাপাশি এতে আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যয় বাড়বে কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলসহ সংসদ বিষয়টি বিবেচনা করলে তখন এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

ছবি: সংগৃহীত
সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলকে যুক্ত করার আহ্বান
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলকে যুক্ত করার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ কমিটির আলোচনায় অংশ নিতে বিরোধী দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, সবার সঙ্গে আলোচনা করে অংশগ্রহণমূলক একটি সংশোধনী আনতে চায় সরকার। জুলাই জাতীয় সনদের যেসব বিষয়ে বিভিন্ন দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে, বিরোধী দল আলোচনায় এলে সেগুলো নিয়েও কথা হতে পারে।
তবে জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে প্রণয়ন ও স্বাক্ষর হয়েছে, সরকার সেটি বাস্তবায়ন করতে চায় বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর নিয়ে ভিন্নমত
একজন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী থাকার মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত রাখার প্রস্তাব নিয়েও বৈঠকে ভিন্নমত এসেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কেউ কেউ মনে করেন, এভাবে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণ করে দেওয়া অগণতান্ত্রিক। তাদের যুক্তি, কেউ ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করলে এবং জনগণ তাকে আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চাইলে তার সেই সুযোগ থাকা উচিত।
তবে বিএনপি এ প্রস্তাব থেকে সরে আসেনি বলেও জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য। তার ভাষ্য, কোনো ব্যক্তি যেন মোট ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রীর পদে না থাকেন, সেটিই বিএনপির অবস্থান।
বিরোধী দল সংসদে ভিন্ন কোনো প্রস্তাব দিলে তখন তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলেও জানান তিনি।
আরও যেসব বিষয়ে মতামত এসেছে
বৈঠকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা, সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তনের বিষয়েও মতামত এসেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বৈঠকগুলো থেকে পাওয়া প্রস্তাব একত্র করে বিশেষ কমিটি তা পর্যালোচনা করবে।
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, পরবর্তী সময়ে নারী নেতৃত্ব, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন এবং জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করবে কমিটি। বিচারক, আইনজীবী, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদেরও আলোচনায় ডাকা হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার ও আহতদের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। সব পক্ষের মতামত নেওয়ার পর সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিবেদন তৈরি করবে কমিটি।
প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আসবে সংবিধান সংশোধন বিল
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের পর তার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন বিল আনা হবে।
এর আগে সংবিধান সংশোধন কমিটি সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি, জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রথম বৈঠকে কমিটির কর্মপরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। তবে এসব বৈঠকের কোনোটিতেই বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছিল না।
গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ শূন্য রাখা হলেও সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কোনো নাম প্রস্তাব করেনি। সংসদে দলগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কমিটির ধারণাগত ভিত্তিই তারা গ্রহণ করে না; তাই এতে সদস্য দেওয়ারও প্রশ্ন আসে না।
এনএনবাংলা/
