স্কলাস্টিকার ৭২৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ, অন্য কোম্পানিকে দিয়েছে ৪২৭ কোটি

দেশের অভিজাত ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কলাস্টিকা লিমিটেডের ৭২৭ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে আইএফআইসি ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণদায় ছিল ৭৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকঋণের বিপুল দায় থাকা সত্ত্বেও স্কলাস্টিকা ক্রিসেন্ট লিমিটেড নামের আরেকটি কোম্পানিকে ৪২৭ কোটি টাকা দিয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে তথ্য উঠে এসেছে।
২৫ অক্টোবর একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রিসেন্ট লিমিটেডের পরিচালকদের সঙ্গে বেক্সিমকো গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র রয়েছে। অন্যদিকে, স্কলাস্টিকার ঋণদাতা আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন বেক্সিমকো গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার সালমান এফ রহমান। এসব তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে স্কলাস্টিকার ঋণ, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আইএফআইসি ব্যাংকে স্কলাস্টিকার প্রায় পুরো ঋণই খেলাপি
আইএফআইসি ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে স্কলাস্টিকা লিমিটেডের মোট ঋণদায় ছিল ৭৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭২৭ কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণদায়ের প্রায় ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশই খেলাপি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্কলাস্টিকার একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংকঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঋণ পরিশোধের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ব্যাংক নথিতে বিপুল অঙ্কের ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
স্কলাস্টিকার নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনেও বড় অঙ্কের ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক দায়ের তথ্য রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, ব্যাংক ওভারড্রাফট এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের হিসাব প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থার বিষয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ক্রিসেন্ট লিমিটেডকে ৪২৭ কোটি টাকা দেওয়ার তথ্য
স্কলাস্টিকার আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, প্রতিষ্ঠানটি ক্রিসেন্ট লিমিটেডকে ৪২৭ কোটি টাকা দিয়েছে। স্কলাস্টিকার নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এ অর্থের তথ্য পাওয়া গেছে।
ক্রিসেন্ট লিমিটেডের নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি থাকলেও কোম্পানিটির পরিচালকদের দেওয়া কয়েকটি ঠিকানার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের অসংগতি দেখা গেছে। ফলে কোম্পানিটির বাস্তব কার্যক্রম, পরিচালকদের অবস্থান এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) নথি অনুযায়ী, ক্রিসেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফ। অন্য দুই পরিচালক হলেন সালাউদ্দিন খান মজলিস ও গাজী মনিরুল ইসলাম। কোম্পানির পরিচালকদের তথ্যসংবলিত ফরম-১২-তে তাদের নাম, ঠিকানা ও দায়িত্বের বিবরণ রয়েছে। ২০২৩ সালের ৩১ মে তাদের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকার তথ্যও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্রিসেন্টের পরিচালকদের সঙ্গে বেক্সিমকোর যোগসূত্র
ক্রিসেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফ ও পরিচালক সালাউদ্দিন খান মজলিসের সঙ্গে নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের সম্পর্ক রয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বেও ছিলেন। নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের মধ্যে আব্দুর রউফ ও সালাউদ্দিন খান মজলিসের পাশাপাশি সালমান এফ রহমান এবং তার ভাই এ এস এফ রহমানের নামও রয়েছে। এভাবে স্কলাস্টিকার কাছ থেকে ৪২৭ কোটি টাকা পাওয়া ক্রিসেন্ট লিমিটেডের পরিচালকদের সঙ্গে বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ক্রিসেন্টকে অর্থ দেওয়া স্কলাস্টিকার ঋণদাতা ব্যাংক আইএফআইসি। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন সালমান এফ রহমান। স্কলাস্টিকা ও এর মূল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এসেন্ট গ্রুপের সঙ্গে সালমান এফ রহমান এবং বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগের তথ্যও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সালমান এফ রহমান ও বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্কলাস্টিকার সেবাগ্রহীতা ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে, বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিরাই ছিলেন স্কলাস্টিকার কাছ থেকে বিপুল অর্থ পাওয়া ক্রিসেন্ট লিমিটেডের পরিচালনায়।
ক্রিসেন্টের ব্যাংকঋণ প্রায় ৬৯৫ কোটি টাকা
ক্রিসেন্ট লিমিটেডের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতেও বড় অঙ্কের ব্যাংকঋণের তথ্য রয়েছে। প্রতিবেদনটির সংশ্লিষ্ট অংশে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩১৮ কোটি ৭১ লাখ ২৭ হাজার ২৮৫ টাকা। এর বিপরীতে আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখার তিনটি ঋণ হিসাবের উল্লেখ রয়েছে।
একই আর্থিক বিবরণীতে ব্যাংক ওভারড্রাফটের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩৭৬ কোটি ৩৯ লাখ ৫৮ হাজার ৯০৭ টাকা। এর মধ্যে ঢাকা ব্যাংকের বনানী শাখা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখার ঋণ হিসাব রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও ব্যাংক ওভারড্রাফট মিলিয়ে এই দুই খাতে ক্রিসেন্ট লিমিটেডের দায় প্রায় ৬৯৫ কোটি ১১ লাখ টাকা। এ ছাড়া নিরীক্ষিত হিসাবে বিভিন্ন অগ্রিম, পাওনা, আয়কর সমন্বয় ও অন্যান্য দায়ের তথ্য রয়েছে। এসব হিসাব কোম্পানিটির আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংকঋণের ব্যাপকতা তুলে ধরে।
পরিচালকদের ঠিকানা নিয়ে অসংগতি
ক্রিসেন্ট লিমিটেডের পরিচালকদের ঠিকানা যাচাই করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে।
নথি অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফের ঠিকানা রাজধানীর ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ৪৮ নম্বর বাড়ি। তবে অনুসন্ধানে ওই ঠিকানায় তার অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাড়ির নম্বরের ধারাবাহিকতার সঙ্গেও নথিতে দেওয়া ঠিকানার অসংগতি পাওয়া গেছে।
অন্য পরিচালক গাজী মনিরুল ইসলামের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে মিরপুর-১ এলাকায় বেক্সিমকো রিয়েল এস্টেটের নিয়ন্ত্রণাধীন মানসী লেক ভিউ অ্যাপার্টমেন্টের একটি ভবনে। কিন্তু অনুসন্ধানে নথিতে উল্লিখিত ভবনটি পাওয়া যায়নি।
কোম্পানিটির আরেক পরিচালক সালাউদ্দিন খান মজলিসের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে রাজধানীর ইস্কাটন প্লাজায়। সেখানে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মীর কাছ থেকে তার মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। তবে অনুসন্ধানের সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পরিচালকদের নাম ও ঠিকানা কোম্পানির নিবন্ধন নথিতে থাকলেও মাঠপর্যায়ে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারার বিষয়টি ক্রিসেন্টের বাস্তব কার্যক্রম ও আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্কলাস্টিকার কাছ থেকে ৪২৭ কোটি টাকা পাওয়ার তথ্যের কারণে কোম্পানিটির ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও অর্থের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিষ্ঠাতা ইয়াসমিন মুর্শেদের মৃত্যুর পর নেতৃত্বে মাদিহা মুর্শেদ
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে স্কলাস্টিকা দেশের উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার অন্যতম পরিচিত প্রতিষ্ঠান। মানসম্মত ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা, কঠোর শৃঙ্খলা ও উচ্চ শিক্ষাব্যয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানটি অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। রাজধানীর বিভিন্ন শাখায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করে।
স্কলাস্টিকার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কূটনীতিক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ইয়াসমিন মুর্শেদ। ২০২৩ সালে তার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় রয়েছেন সৈয়দা মাদিহা মুর্শেদ।
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত টিউশন ফি, ভর্তি ফি ও অন্যান্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অর্থ আদায় করা হয়। এ কারণে বিপুল ব্যাংকঋণের পাশাপাশি অন্য একটি কোম্পানিকে শত শত কোটি টাকা দেওয়ার তথ্য প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
খেলাপি ঋণে চাপে আইএফআইসি ব্যাংকও
স্কলাস্টিকার ঋণদাতা আইএফআইসি ব্যাংক নিজেও বিপুল খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৬৩ শতাংশ।
ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের সঙ্গে বেক্সিমকো গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা এবং ক্রিসেন্ট লিমিটেডের পরিচালকদের বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের তথ্য স্কলাস্টিকা ও ক্রিসেন্টের আর্থিক লেনদেনকে আরও আলোচনায় এনেছে।
ব্যাংকঋণের অর্থের ব্যবহার, ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অর্থের প্রবাহ তদারকি করা ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব। স্কলাস্টিকার বিপুল খেলাপি ঋণ এবং ক্রিসেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য ঋণ যাচাই ও তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঋণের অর্থের অপব্যবহার এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাংকের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। স্কলাস্টিকার ঘটনা সেই সংকটের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ, এখানে ঋণগ্রহীতা কোনো প্রচলিত শিল্পকারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং দেশের অন্যতম পরিচিত একটি অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
স্কলাস্টিকার ৭২৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ, ক্রিসেন্ট লিমিটেডকে ৪২৭ কোটি টাকা দেওয়ার তথ্য এবং দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক—সব মিলিয়ে ঋণ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও ব্যাংকিং তদারকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এনএনবাংলা/
