জমকালো দুর্গাপূজায় প্রশংসা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে যে ৩ কঠিন পরীক্ষা

বাংলাদেশে জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজার আয়োজন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রশংসা পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উৎসবকে কেন্দ্র করে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ রাজনৈতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। তবে এই সাফল্য ধরে রাখা সহজ হবে না। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হিন্দু ভোটারদের আস্থা ধরে রাখা এবং শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ—এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন তিনি।
বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বাঙালি হিন্দু অধ্যুষিত বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্গাপূজা অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিনের এই আয়োজন কোটি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে যুক্ত। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের অধীনে এটিই ছিল প্রথম দুর্গাপূজা। উৎসবের আয়োজন, নিরাপত্তা এবং সরকারি সহযোগিতার কারণে তাঁর সরকার প্রশংসা পেয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক বিরোধীদের কেউ কেউ এই আয়োজনের ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেছেন।
তবে উৎসবের সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক আস্থা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় রূপান্তর করাই এখন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।
দেশজুড়ে জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজা, নিরাপত্তায় ব্যাপক প্রস্তুতি
এ বছর বাংলাদেশজুড়ে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ছিল ২৫৮টি মণ্ডপ। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় দেড় হাজার মণ্ডপ বেড়েছে।
উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২ লাখ ১২ হাজার ১১৮ সদস্যকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে আটজন করে এবং অন্যান্য মণ্ডপে ছয়জন করে সদস্য মোতায়েন করা হয়। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয় আরও ১০৪টি স্ট্রাইকিং টিম।
সীমান্তবর্তী আট কিলোমিটারের মধ্যে থাকা প্রায় ১ হাজার ৮০০টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ১৮টি বেইস ক্যাম্প স্থাপন করে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় টহলও জোরদার করা হয়।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকার ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করে। এরপর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর শুক্র ও শনিবারের নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় সরকারি চাকরিজীবীরা কার্যত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসায় দুর্গাপূজার আয়োজন
নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শহর ও মফস্বলে পূজামণ্ডপের বর্ণাঢ্য আয়োজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা পেয়েছে।
ইনফ্লুয়েন্সার ড্যানিয়েল আফজালুর রহমান লিখেছেন, বাংলাদেশে দুর্গাপূজা এতটা জাঁকজমকপূর্ণ ও প্রাণবন্তভাবে উদ্যাপিত হতে তিনি আগে কখনো দেখেননি।
ডেইলি ওয়াদার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেখক, অধিকারকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের অনেকে এবারের দুর্গাপূজার আয়োজনের প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মতে, বিএনপি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় হিন্দু সম্প্রদায় বড় ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপন করতে পেরেছে।
লেখক ও অধিকারকর্মী সাদিকুর রহমান খান, চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং লেখক ফাহাম আবদুস সালামও উৎসবের আয়োজনের প্রশংসা করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন, আগের বছরগুলোতে উৎসব ঘিরে যে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ ছিল, এবারের চিত্র তার থেকে আলাদা।
কলকাতার সাংবাদিক, ইনফ্লুয়েন্সার ও টেলিভিশন উপস্থাপক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষের মন্তব্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ নিয়ে তিনি নিয়মিত সরব ছিলেন।
এবার ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘এ বছর বাংলাদেশে দুর্গাপূজা ছিল অসাধারণ। বাংলাদেশকে অভিনন্দন। চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপের জাঁকজমক দেখে আমি বিস্মিত। কলকাতার পূজামণ্ডপগুলোকে যারা পুরস্কার দেয়, তাদের চট্টগ্রামের মণ্ডপগুলোর জন্য আলাদা পুরস্কারের ব্যবস্থা করা উচিত। কুরিয়ারে ট্রফি পাঠিয়ে দিন।’
প্রথম চ্যালেঞ্জ: সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
দুর্গাপূজার আয়োজন প্রশংসা পেলেও বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি। উৎসব শুরুর আগে চলতি মাসে পূজামণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা ও সংশ্লিষ্ট সহিংসতার অন্তত ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছিল বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ এবং মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি।
সংগঠন দুটি সারা বছর ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ ধরনের হামলা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশের হিন্দু অধিকারকর্মী জয়ন্ত কর্মকার দ্য প্রিন্টকে বলেন, গ্রামপর্যায়ে কিছু হুজুর ও ইসলামপন্থী ধর্মীয় বক্তা এ বছরও প্রতিমা পূজার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁরা প্রতিমা পূজাকে ‘হারাম’ আখ্যা দিয়ে মুসলমানদের দুর্গাপূজার আয়োজনে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জয়ন্ত কর্মকারের ভাষ্য, তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পরও বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর মতে, জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজা আয়োজনের মধ্য দিয়ে মাঠপর্যায়ে হিন্দুদের বাস্তব পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। হিন্দুবিদ্বেষী বক্তব্য ছড়ানো বক্তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ফলে উৎসবকেন্দ্রিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সারা বছর সংখ্যালঘুদের জানমাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা তারেক রহমান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ: হিন্দু ভোটারদের আস্থা ধরে রাখা
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের হিন্দু ভোটারদের বড় একটি অংশ তারেক রহমানের বিএনপিকে সমর্থন করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ না থাকায় বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীকে ক্ষমতার বাইরে রাখার বিষয়টিও এই রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এবারের দুর্গাপূজার আয়োজন হিন্দু ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে বিএনপি সরকারের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে। তবে এই সমর্থন দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সহজ হবে না।
শেখ হাসিনা দেশে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি সত্যিই দেশে ফিরলে হিন্দু ভোটারদের একটি অংশ আবার আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সরকারের বাস্তব পদক্ষেপ আগামী দিনের রাজনৈতিক সমর্থন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে উঠে আসা ছাত্রনেতাদের গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গুরুত্বপূর্ণ নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দুর্গাপূজার সময় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেওয়া বক্তব্যের কারণে আলোচনায় এসেছেন।
মন্দির কমিটির সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়া মন্দিরের জমি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবেন। মন্দির কমিটির তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরের নথিভুক্ত প্রায় আট একর জমির মধ্যে আনুমানিক ৫ দশমিক ৬ একর অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে।
পাটওয়ারীর এই প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের কিছু হিন্দুর মধ্যে সাড়া ফেলেছে। ফলে আগামী দিনে হিন্দু ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখতে বিএনপিকে অন্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হতে পারে।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ: শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর চাপ
তারেক রহমানের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি। শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অবস্থান এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর তৎপরতা হিন্দু ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দুর্গাপূজার সময় কিছু ইসলামপন্থী বক্তার প্রতিমা পূজাবিরোধী বক্তব্যের অভিযোগ এই চাপের বিষয়টিকে সামনে এনেছে।
সরকারকে একদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, হামলার অভিযোগ এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে নিরাপত্তার প্রশ্নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের দায়িত্ব ও সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
সামনে কঠিন পথ, উৎসবের সাফল্য ধরে রাখাই লক্ষ্য
এবারের দুর্গাপূজার আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান সরকার সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তবে উৎসবের জাঁকজমককে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতাসংক্রান্ত সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
হিন্দু সম্প্রদায়ের আস্থা ধরে রাখতে হলে সারা বছর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হামলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা এবং সংখ্যালঘুদের ভোটের সমীকরণ তারেক রহমানের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে এবারের জাঁকজমকপূর্ণ ও মোটামুটি শান্তিপূর্ণ দুর্গাপূজা বিএনপি সরকারের জন্য ইতিবাচক অর্জন। তবে এই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে উৎসবের বাইরেও বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অধিকার, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।
এনএনবাংলা/
