সাম্প্রতিক
নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে অস্বস্তিতে ক্রেতারা ঢাকায় অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা, কতটা কার্যকর হবে? রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা: ৪ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের সুপারিশ, তদন্তে আরও ৪ জন হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, ডেঙ্গুতে একজনের প্রাণহানি তিন ফিফটিতে বাংলাদেশের ৩১৭, প্রথম দিনেই নাটকীয় উত্থান-পতন শেখ হাসিনার আমলে দুই বিচার নিয়ে কী বলেছিলেন নাভি পিল্লাই? কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ-নেপালের মতো ‘নৈরাজ্য’ সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ বিজেপির মোটরসাইকেলে এসে বিকাশকর্মীদের গাড়িতে গুলি, দুই বস্তায় থাকা তিন কোটি টাকা লুট নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল জয়ের পরই আইসিসির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশে দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে ছয় কোটি ২০ লাখ নিম্ন মধ্যবিত্ত
Skip to content

বিবিসি বাংলা’র প্রতিবেদন

বাংলাদেশে দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে ছয় কোটি ২০ লাখ নিম্ন মধ্যবিত্ত

ছবি: সংগৃহীত

‘আর পারা যাচ্ছে না। বাজারে শাক-সবজি থেকে শুরু করে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বাসভাড়া, ঘরভাড়া- সবকিছু যেভাবে বাড়ছে, তাতে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যমসারির কর্মকর্তা আতিকুর রহমান।

ঢাকার মগবাজার এলাকার বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলছিলেন যে, গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার খরচ যেভাবে বেড়েছে, সেটার বিপরীতে সামান্যই আয় বেড়েছে তার। ফলে সংসার চালাতে গিয়ে এখন রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।

‘সবকিছুর খরচ এত বেড়েছে যে বেতনের টাকা দিয়ে মাস পার হচ্ছে না। আগের কিছু সঞ্চয় ছিল, সেটাও এখন প্রায় শেষের দিকে। এভাবে যদি জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে সংসার কীভাবে চালাবো, ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খবর কীভাবে দেবো, সেটাই ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছি না,’ বলেন আতিকুর রহমান।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গত মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, গত চার বছরে দেশটিতে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ লাখ। এর মধ্যে গত এক বছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন।

আরও প্রায় ছয় কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি, যারা এখন নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে অবস্থান করছেন, তারাও দরিদ্র শ্রেণিতে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলেও সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

এমন পরিস্থিতির তৈরি হওয়ার জন্য মোটাদাগে যেসব কারণের কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক, তার মধ্যে ছয়টি বিষয় উঠে এসেছে – কোভিড মহামারি, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কর ও ভর্তুকি পদ্ধতিতে দুর্বলতা।

প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিপুল সংখ্যক এসব মানুষকে সুরক্ষা দিতে না পারলে বাংলাদেশ যে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, দুর্বল অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সেটি সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বছর ছয়েক আগেও বাংলাদেশকে যেখানে দারিদ্র্য বিমোচনে ‘বিশ্বের মডেল’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেখানে আবারও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়তে শুরু করল কীভাবে?


বিশ্বব্যাংক বলছে, গত এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে (প্রতীকী ছবি)। ছবি: বিবিসি বাংলার সৌজন্যে

দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এখন কত?

সাড়ে পাঁচ দশক আগে বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতা অর্জন করে, তখন অর্থনীতির অবস্থা ছিল একেবারেই দুর্বল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির বেশিরভাগ মানুষ তখন ছিল দরিদ্র।

পরবর্তীতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ক্রমেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে থাকে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, সত্তরের দশকে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ ছিল, পাঁচ দশকের মধ্যে সেটি উল্লেখযোগ্য হারে কমে ২০ দশমিক পাঁচ শতাংশে নেমে আসে।

২০২০ সালে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনে ‘বিশ্বের মডেল’ ঘোষণা করেছিল বিশ্বব্যাংক।

এর দুই বছরের মাথায় দারিদ্র্যের হার আরও কমে ১৮ দশমিক সাত শতাংশে দাঁড়ায় বলে বিবিএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে তখন অতি দারিদ্র্যের হার কমে হয়েছিল পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশ।

দারিদ্র্য বিমোচনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশটি পুরোপুরিভাবে দারিদ্র্যমুক্ত হবে বলে তখন পূর্বাভাস দিয়েছিলেন পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তারা।

কিন্তু বছর না ঘুরতেই পাল্টে যেতে থাকে পরিস্থিতি।

বাংলাদেশে টানা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির হার উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ছবি: বিবিসি বাংলার সৌজন্যে

করোনা মহামারির সময় অফিস-আদালত, শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন কাজ-কর্মে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল, ক্রমেই সেটির প্রভাব দৃশ্যমান হতে থাকে অর্থনীতিতে।

বিবিএসের হিসেবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ছিল সাত দশমিক এক শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেটি কমে চার দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে।

চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরও কমে তিন দশমিক চার শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

এ অবস্থায় বাংলাদেশে আবারও বাড়তে দেখা যাচ্ছে দারিদ্র্যের হার।

২০২২ সালে দেশটিতে অতি দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশ, ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে ১০ দশমিক এক শতাংশ হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

সেইসঙ্গে, মোট দারিদ্র্যের হারও আগের চেয়ে বেড়ে প্রায় ২২ দশমিক পাঁচ শতাংশে পৌঁছেছে বলে সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই হিসেবে, বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এখন তিন কোটি ৫০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে অনুমান করছে সংস্থাটি।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। ছবি: বিবিসি বাংলার সৌজন্যে

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।

‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শিরোনামে গত মঙ্গলবার সংস্থাটি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে বলা হয়েছে যে, দেশটির অর্থনীতিতে এখনো প্রবৃদ্ধি কমার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এর একটা বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়।

মূলত করোনা মহামারির কারণে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার একপর্যায়ে দেশটির অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। যেসব প্রতিষ্ঠান তখন টিকে ছিল, তারাও অর্থনৈতিক চাপের মুখে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটে।

‘এতে বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে অনেকেই পরে আর ফরমাল সেক্টরে ফিরে আসতে পারেননি, অর্থাৎ কাজ খুঁজে পাননি বলে জানা যাচ্ছে,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন।

করোনাকালে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছিল যে, পরবর্তীতে নতুন বিনিয়োগ আসলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছাবে।

কিন্তু বাস্তবে সেটি ঘটেনি।

ব্যাংকিংখাতের সংকট এখনও কাটেনি। ছবি: বিবিসি বাংলার সৌজন্যে

‘উল্টো দেখা গেছে, লাগাতার অনিয়ম-দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের মতো ঘটনার কারণে ব্যাংকিংখাতসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনেক খাত ভেঙে পড়েছে,’ বলেন ড. ফাহমিদা খাতুন।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের।

এরপর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেশ নাজুক হয়ে পড়ে। সেটার কারণেও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেভাবে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাননি না বলে জানাচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে জ্বালানি তেলের বাজারে। সেইসঙ্গে, বেড়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট।

এতে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে নতুন করে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি

বাংলাদেশে টানা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির হার উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে এর বড় প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

মূলত করোনা মহামারিতে চাকরি হারানোসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মানুষের আয় কমে গেছে।

এর মধ্যেই বছর বছর বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। যদিও গত দুই বছরে কিছুটা কমে এখন মূল্যস্ফীতি আট দশমিক তিন শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

‘তারপরও সেটা সহনীয় পর্যায়ে নামেনি। মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে,’ বলেন অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন।

এতে বাজারে বাড়তে দেখা যাচ্ছে জিনিসপত্রের দাম।

করোনা মহামারির পর বাংলাদেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি (প্রতীকী ছবি)। ছবি: বিবিসি বাংলার সৌজন্যে

এর মধ্যেই দফায় দফায় জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে সাধারণ মানুষের খরচ বেড়ে গেছে। সংসার চালাতে অনেকে নিজের জমানো টাকাও খরচ করছেন।

‘সঞ্চয় রাখবো কীভাবে? সংসার চালাতেই তো হিমশিম খাচ্ছি,’ বলছিলেন খুলনার বাসিন্দা বিলকিস আকতার।

কেউ কেউ আবার জায়গা-জমিসহ মূল্যবান বিভিন্ন সম্পদ বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছে বলেও জানা যাচ্ছে।

‘কিন্তু জায়গা-জমি বিক্রি করে কয়দিন চলা যায়, বলেন? এখন প্রত্যেক মাসে আমি ৩০- ৪০ হাজার টাকার বেশি দেনা থাকি,’ বলেন ঢাকার এক বাসিন্দা।

আয়ের বিপরীতে ক্রয় ক্ষমতা কমে যাওয়ার এমন পরিস্থিতিতে দেশে ক্রমেই দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

ধনীরাই বেশি সুবিধা পাচ্ছে

গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকেই বিএনপি সরকার দাবি করে আসছে যে, তারা নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থার সৃষ্টির জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

যদিও বাস্তবতা সেভাবে বিনিয়োগ বাড়তে দেখা যায়নি।

‘যার ফলে নতুন কর্মসংস্থানও সেভাবে সৃষ্টি হয়নি,’ বলেন অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন।

অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব ভর্তুকি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, সমাজের গরিব শ্রেণির মানুষেরা সেগুলোর সুবিধা কম পাচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পান না।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে ৩৮ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছেন, সেটিও ধনীদের তুলনায় কম বলে জানা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ছবি: বিবিসি বাংলার সৌজন্যে

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সমাজের নিচের দিকে থাকা ২০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বছরে গড়ে সাত হাজার ১৪০ টাকার সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পান। এর বিপরীতে, সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা বছরে পাচ্ছেন ১০ হাজার ৪৭২ টাকার সুবিধা।

আবার, বিদ্যুৎখাতে সরকার যে ভর্তুকি দেয়, এর সুবিধা ধনী-গরিব নির্বিশেষ পান। এক্ষেত্রে যারা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তারা ভর্তুকির সুবিধা বেশি পান বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ধনীরাই বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে।

‘এর ফলে সরকার ভর্তুকি দিলেও সেটির সুফল দরিদ্ররা সেভাবে পাচ্ছেন না,’ বলেন অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন।

বিশ্বব্যাংকের হিসেবে, বাংলাদেশে সমাজের ওপরের দিকে থাকা ২০ শতাংশ ধনীর জন্য বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির এক-তৃতীয়াংশ খরচ হচ্ছে।

‘কাজেই এভাবে ঢালাও ভর্তুকি না দিয়ে সরকারের বরং দরিদ্রদের জন্য এমন কর্মসূচি নেওয়া উচিৎ, যাতে করে তারাই সুফলটা বেশি পেতে পারে,’ বলেন ফাহমিদা খাতুন।

তবে বিএনপি সরকার যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু করেছে, সেটি প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছাতে পারলে দারিদ্র্য কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

‘বিদ্যমান পদ্ধতিতে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দেওয়া হলে বছরে ১৬ লাখের মতো মানুষ দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারবে। কিন্তু এই কার্ড যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের দিতে পারলে বছরে সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারবে,’ বলেন বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা।

সংসারে খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। ছবি: বিবিসি বাংলার সৌজন্যে

রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে রাজস্ব ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথাও বলা হয়েছে।

সংস্থাটি বলছে, ভর্তুকি ও সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া হলেও সামগ্রিক কর ব্যবস্থা তাদের যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পারছে না।

বর্তমান ব্যবস্থায়, ভর্তুকি ও সহায়তা কর্মসূচি দিয়ে সরকার গরিবদের যে পরিমাণ অর্থ সহায়তা দিচ্ছে, সেটার চেয়েও বেশি অর্থ তুলে নিচ্ছে পরোক্ষ করের মাধ্যমে।

ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো সরকারের কাছ থেকে যতটা পায়, তার চেয়ে বেশি অর্থ কর হিসেবে পরিশোধ করছে।

এ অবস্থায় রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক করনীতি নির্ধারণ, রাজস্ব বাড়াতে করনীতি ও কর প্রশাসনকে পৃথক করা, সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য সমন্বয় করে কর ফাঁকি শনাক্ত করা এবং অকার্যকর করছাড় পর্যায়ক্রমে কমানোর সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।

সেইসঙ্গে, অধিকতর ডিজিটালাইজেশন, করদাতাদের সমন্বিত ডেটাবেস ও শনাক্তকরণ নম্বর প্রবর্তন এবং কর পরিপালন (কমপ্লায়েন্স) বাড়ানোর পরামর্শও দিয়েছে সংস্থাটি।

সম্প্রতি ফ্যামিলি কার্ড প্রদান শুরু করেছে বিএনপি সরকার। ছবি: বিবিসি বাংলার সৌজন্যে

কী বলছে সরকার?

সরকার বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেড়েছে।

এছাড়া মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকখাতের সংকট, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সমস্যাগুলো তারা আগের সরকারগুলোর কাছ থেকে ‘উত্তরাধীকারসূত্রে’ পেয়েছেন।

‘প্রত্যেকটাই কিন্তু বহিঃস্থ কারণ, অথবা উত্তরাধীকারসূত্রে প্রাপ্ত,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি দাবি করেন, সরকার এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ সার্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

‘আমাদের দিক থেকে মূল্যস্ফীতিটা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে,’ বলেন ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে যেসব সংস্কারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।

(প্রতিবেদনটি বিবিসি নিউজ বাংলা থেকে নেওয়া)

এনএনবাংলা/