ঢাকায় অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা, কতটা কার্যকর হবে?

রাজধানী ঢাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে জোনভিত্তিক রং নির্ধারণ, যানবাহনের সংখ্যা সীমিত করা এবং নতুন নীতিমালা প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। যানজট কমানো ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
আট জোনে আলাদা রঙের অটোরিকশা
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের চারটি করে মোট আটটি জোনে অটোরিকশা ও ই-বাইকের জন্য আলাদা রং নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি জোনে এসব যানবাহনের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে। এক জোনের অটোরিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না। নির্ধারিত সংখ্যার বাইরে নতুন অটোরিকশা নিবন্ধনের সুযোগও থাকবে না।
বৃহস্পতিবার ঢাকার মিরপুরে একটি কর্মসূচি শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ই-রিকশা ও ই-বাইক চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে সরকার নীতিমালা ও বিধি তৈরির কাজ করছে। তার মতে, অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা, যানজট ও অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে।
নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগে অতীতের অভিজ্ঞতা
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। ২০২৪ সালের মে মাসে চালক ও মালিকদের আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি দেয়। এরপর রাজধানীর অলিগলি ও প্রধান সড়কের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা শহরেও এসব যানবাহনের চলাচল বেড়েছে।
সম্প্রতি অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রতিবাদে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চালক ও মালিকদের একাংশ বিক্ষোভ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, এই যানবাহনের কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও এগুলো লাগামহীন ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে দেওয়া হবে না।
বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় বিশেষজ্ঞদের
বুয়েটের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক মনে করেন, জোনভিত্তিক পরিকল্পনা কাগজে আকর্ষণীয় হলেও তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে প্যাডেলচালিত রিকশার ক্ষেত্রেও জোনভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরে তা কার্যকর থাকেনি।
তার মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অদূরদর্শিতা, সময়মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করে। অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নিবন্ধন দেওয়ার আগে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ ও বিদ্যুৎ বিভাগের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া এই পরিকল্পনা কার্যকর করা কঠিন হবে। রাজধানীতে বর্তমানে কত অটোরিকশা চলাচল করছে, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানও নেই। সরকারি হিসাবে ৮০ হাজার থেকে এক লাখের কথা বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি বলে ধারণা করা হয়।
গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
এদিকে রাজধানীর যানজট ও গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা নিরসনে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বিশেষ বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির বরাত দিয়ে বাসস জানিয়েছে, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা এবং যানজট নিরসনের উপায় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
রাজধানীতে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরও যানজট ও সড়কের বিশৃঙ্খলা পুরোপুরি দূর হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশার জন্য নতুন নীতিমালা ও জোনভিত্তিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়, নজরদারি এবং পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ওপর।
তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা
এনএনবাংলা/
