উদয়ন স্কুলে ‘ছাত্রীর যৌন হয়রানির’ প্রতিবাদ করায় শাস্তির মুখে ১০ শিক্ষার্থী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সহপাঠী ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে আপত্তিকর ছবি তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে উল্টো শাস্তির মুখে পড়েছেন বিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষার্থী। তাদের কয়েকজনকে সাময়িকভাবে ক্লাসের বাইরে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। অভিযুক্তকে ছাড়পত্র (টিসি) দেওয়া, ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে নেওয়া এবং নিরপেক্ষ তদন্তসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গত মে মাস থেকে নবম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী বিভিন্ন সময়ে ছাত্রীদের অস্বস্তিকরভাবে তাকানো, আপত্তিকর বার্তা পাঠানো ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করে আসছে। এমনকি এক ছাত্রীর ছবি এআই দিয়ে বিকৃত করে আপত্তিকর ছবি তৈরির অভিযোগও রয়েছে। বিষয়গুলো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানাতে চাইলেও অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি তাদের।
অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদের ডিনের দাবি, গত ৭ অক্টোবর কয়েকজন শিক্ষার্থী তার ছেলেকে জোর করে নিয়ে মারধর করে। এ সময় জোর করে স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তিনি।
ডিনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ অক্টোবর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে কমিটিতে অভিযুক্তের বাবার অনুষদভুক্ত বিভাগের দুজন সহকারী প্রক্টর থাকায় এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী শিক্ষার্থীরা।
শাস্তির মুখে পড়া শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ৭ অক্টোবর ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তারা অভিযুক্তের মুখোমুখি হন। পরে ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী সেখানে জড়ো হয়ে আপত্তিকর ছবি ও বার্তা মুছে ফেলার দাবি জানান। একপর্যায়ে অভিযুক্তকে আজিমপুর সরকারি কলোনিতে নিয়ে মারধর করা হয় বলে স্বীকার করেছেন উপস্থিত এক শিক্ষার্থী।
পরদিন ৮ অক্টোবর পরীক্ষার সময় প্রতিবাদে অংশ নেওয়া ১০ শিক্ষার্থীকে শিক্ষকদের কক্ষে নিয়ে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাদের পরীক্ষা ও ক্লাস থেকে বিরত রাখা হয়। অভিভাবকদের প্রতিবাদের মুখে আলাদা কক্ষে পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হলেও ক্লাসে ফেরানো হয়নি। আগামী ১২ নভেম্বর থেকে তাদের বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা।
এ ছাড়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর পরিবারকে ফোন করে ভয়ভীতি দেখানো এবং টিসির হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের দাবি, অভিযোগ জমা দিতে গেলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করেনি। এমনকি অভিযোগসংক্রান্ত ভিডিও ধারণের সময় এক শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল হোসেন ব্যাপারী পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো. আরিফুর রহমানও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ নাকচ করে বলেন, অভিযুক্তকে মারধরের অভিযোগ থাকায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের আপাতত ‘অপারেশন স্টে’-তে রাখা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকেও ক্লাসের বাইরে রাখা হয়েছে। পরীক্ষার আগে তাদের শিখনঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করা হবে।
তদন্ত কমিটিতে একই অনুষদের দুজন সহকারী প্রক্টর রাখার বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, তাদের অনুষদগত সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আগে জানা ছিল না। শিক্ষার্থীরা কমিটির প্রতি অনাস্থা জানানোয় বিষয়টি উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পাশাপাশি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা ‘হয়রানিমুক্ত স্কুল চাই’, ‘মেয়েদের নিরাপত্তা চাই’ এবং ‘ওর বাবা ডিন হলে আমাদের বাবা কি রিকশাওয়ালা?’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। তাদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, ক্লাস থেকে বিরত রাখা শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়া এবং প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ তদন্ত।
এনএনবাংলা/
