যবিপ্রবি অধ্যাপকের ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট অনুমোদন, কৃষকের সার খরচ কমার সম্ভাবনা

দীর্ঘ পাঁচ বছর দুই মাস অপেক্ষার পর ন্যানো ইউরিয়া উদ্ভাবনের পেটেন্ট অনুমোদন পেয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) অধ্যাপক ড. মো. জাভেদ হোসেন খান। তাঁর দাবি, উদ্ভাবিত এই সার ব্যবহার করে এক বিঘা জমিতে চাষাবাদের সার খরচ প্রচলিত ইউরিয়ার তুলনায় প্রায় ৮২ শতাংশ কমানো সম্ভব। দেশের কৃষিতে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিকাশে এই উদ্ভাবন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বাংলাদেশ পেটেন্ট অফিস তাঁর উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট অনুমোদন দেয়।
অধ্যাপক ড. জাভেদ হোসেন খান ২০২১ সালে ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্টের জন্য আবেদন করেছিলেন। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে পেটেন্ট অনুমোদন পাওয়ায় উদ্ভাবনটির আরও উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গবেষক জাভেদ হোসেন খানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহার করে এক বিঘা জমিতে সার খরচ হতে পারে মাত্র ২৩০ টাকা। অন্যদিকে, প্রচলিত ইউরিয়া সার ব্যবহারে একই পরিমাণ জমিতে ভর্তুকিসহ বর্তমানে খরচ প্রায় ৪ হাজার ২০০ টাকা। সে হিসাবে ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে সার খরচ কমতে পারে প্রায় ৮২ শতাংশ। এই সার স্প্রে মেশিনের মাধ্যমে প্রয়োগ করতে হবে।
দীর্ঘ গবেষণার পর মাঠপর্যায়ে ন্যানো ইউরিয়ার ব্যবহারেও সাফল্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন গবেষক। তাঁর মতে, যথাযথভাবে প্রয়োগ করা গেলে এই সার ইউরিয়ার ব্যবহার দক্ষতা বাড়ানো, সারের অপচয় কমানো, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং ফসলের ফলন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি সারের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে পরিবেশের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়, তা কমানোরও সম্ভাবনা রয়েছে।
পেটেন্ট অনুমোদনের প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক ড. জাভেদ হোসেন খান সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর আজ পেটেন্টের অনুমোদন পেয়েছি। এই অর্জনের পেছনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর আন্তরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁদের প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের মাটি, দেশের কৃষি ও কৃষকের স্বার্থকে সামনে রেখেই আমরা কাজ করছি। ন্যানো ইউরিয়া কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে ইউরিয়া সারের ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি, সারের অপচয় হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং ফসলের ফলন বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশের ওপর সারের অতিরিক্ত ব্যবহারের চাপ কমাতেও এটি ভূমিকা রাখবে।’
বাংলাদেশে ন্যানোটেকনোলজি গবেষণার বিকাশে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন অধ্যাপক জাভেদ হোসেন খান। ২০১৩ সাল থেকে তিনি যবিপ্রবিতে নিজস্ব গবেষণাগার পরিচালনা করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ন্যানো-বায়ো অ্যান্ড অ্যাডভান্সড মেটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং (ন্যাম) ল্যাবে ন্যানোটেকনোলজি ও উন্নত উপকরণ নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৫ সালে তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ফেলো নির্বাচিত হন।
সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট অনুমোদন উদ্ভাবনটিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, মাঠপর্যায়ে কার্যকারিতা যাচাই এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতার মাধ্যমে এর সম্ভাবনা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে উদ্ভাবনটি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
যবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর এই অর্জনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ড. জাভেদ হোসেন খানের দীর্ঘদিনের সাধনা ও গবেষণার ফসল এই ন্যানো ইউরিয়া সারের পেটেন্ট প্রাপ্তি যবিপ্রবি পরিবারসহ সমগ্র জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। এই যুগান্তকারী উদ্ভাবন কেবল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সক্ষমতাই প্রমাণ করে না, বরং দেশের কৃষি খাতে এক বিরাট বিপ্লব ঘটানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।’
এনএনবাংলা/
