পেনশনের টাকায় শিশুদের জন্য শিক্ষক গড়ে তুললেন ‘প্রকৃতির পাঠশালা’

নওগাঁর সাপাহার উপজেলার তিলনা গ্রামের ধন্টিপাড়ায় গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী শিশুপার্ক, যা স্থানীয়দের কাছে ‘প্রকৃতির পাঠশালা’ নামে পরিচিত। চাঁচাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শামসুর রহমান নিজের পেনশনের টাকায় শিশুদের মানসিক বিকাশ ও চিত্তবিনোদনের জন্য এই অনন্য উদ্যোগ নিয়েছেন।
২০২১ সালে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর শামসুর রহমান নিজের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া প্রায় কোটি টাকা মূল্যের ৯০ শতাংশ জমির ওপর এই পার্কটি নির্মাণ করেন। পেনশনের পুরো টাকা দিয়েও কাজ শেষ না হওয়ায় নিজের আম বাগান ও ধান বিক্রির প্রায় ৫০ লাখ টাকা এখানে বিনিয়োগ করেন তিনি। ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই পার্কে কোনো প্রবেশমূল্য নেই। প্রতিদিন বিকেলে দূর-দূরান্ত থেকে শিশুরা ও তাদের অভিভাবকেরা এখানে এসে ভিড় জমান। বিশেষ করে ঈদ বা পূজার মতো উৎসবের দিনগুলোতে এই পার্কটি মুখরিত হয়ে ওঠে উৎসবের আমেজে।
পার্কটির মূল আকর্ষণ হলো এর ভেতরে থাকা বাঘ, সিংহ, কুমিরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর জীবন্ত অবয়বের প্রতিকৃতি। খাঁচার ভেতর রাখা এসব পশুর নাম সবার আগে বলার জন্য শিশুরা মেতে ওঠে প্রতিযোগিতায়। বিনোদনের পাশাপাশি এখানে শিশুদের ফুল ও ফলের গাছের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। খেলার জন্য রয়েছে স্লিপার, দোলনাসহ আধুনিক সব খেলনা সামগ্রী।
সাপাহার উপজেলা সদর থেকে মাত্র সাড়ে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়বে একটি দৃষ্টিনন্দন তোরণ ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের স্ট্যান্ড। মাটির তৈরি দোতলা বাড়িটিতে বাহারি রঙের কারুকাজ থাকায় দূর থেকে এটিকে একটি সমৃদ্ধ জাদুঘরের মতো মনে হয়। ভেতরে রয়েছে ২০০৪ সালে নির্মিত একটি সুদৃশ্য পুকুরঘাট, পানির ফোয়ারা, ওয়াকওয়ে এবং দর্শনার্থীদের বসার জন্য রঙিন ছাতা ও টাইলস দিয়ে বাঁধানো আসন।
চাকরিজীবনেও শামসুর রহমান বিদ্যালয়ে বাগান করা ও পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতেন। নিজের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সম্পর্কে শামসুর রহমান বলেন, “আমাদের উপজেলায় শিশুদের চিত্তবিনোদনের কোনো সুযোগ নেই। গ্রামীণ অঞ্চলের সব ফাঁকা জায়গাই এখন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমি সারা জীবন শিশুদের সাথে কাটিয়েছি, জীবনের শেষ সময়টুকুও তাদের কল্যাণে এবং মানসিক বিকাশের জন্য কাজ করে যেতে চাই।”
প্রতিদিন ভোরে নিজেই পার্ক পরিষ্কার করা এবং গাছের পরিচর্যা করার মাধ্যমে দিন শুরু করেন এই পরম শিক্ষক। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান ছাড়াই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই ‘প্রকৃতির পাঠশালা’ আজ গ্রামীণ শিশুদের শিক্ষার এক উন্মুক্ত আঙিনায় পরিণত হয়েছে।
এনএনবাংলা/ইএস
