সাম্প্রতিক
তিতাসের ‘সিস্টেম লস’ বছরে ১০ কার্গো এলএনজির সমপরিমাণ গ্যাস হাম ও উপসর্গে আরও ৩ মৃত্যু, প্রাণহানি ছাড়াল ১ হাজার জুলাই জাদুঘরে অশ্রুসজল রাষ্ট্রপতি, বললেন ‘মূল্য দিয়েছি অনেক বেশি’ সালমান শাহর মৃত্যু: ডনের বিরুদ্ধে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ গোপনের অভিযোগ ইতালীয় গণমাধ্যমে বাঁধনের ওপর হামলার খবর, তদন্তে বিশেষ পুলিশ ‘দিগোস’ মেট্রোরেলের ২৭ বিয়ারিং প্যাড ‘ক্রিটিক্যাল’, ৪৬ পিলারে ফাটল: সংসদে মন্ত্রী আশির দশকে ফিরছে সোশ্যাল মিডিয়া, এআই ছবির ট্রেন্ডে নেটিজেনরা বিএনপি ক্ষমতায় আর বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট হবে না, দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হবে না— সেটা হতে পারে না: রুমিন ফারহানা ডিসেম্বরে হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে যা বললেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি শ্বেতপত্রের আলোকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী
Skip to content

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তৃতি : বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম ঊর্ধ্বমুখী

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ইরান পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম হু হু করে বেড়ে গেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গ্যাস রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘কাতার এনার্জি’ (QatarEnergy) সোমবার তাদের উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেছে।

প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের গ্যাস স্থাপনাগুলোতে ‘সামরিক হামলা’ হওয়ার পর নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর পরপরই সোমবার বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দেয়। গত সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালীর কাছে অন্তত তিনটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। এর ফলে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম ব্যারেল প্রতি সাময়িকভাবে ৮২ ডলার (৬১ পাউন্ড) স্পর্শ করেছে।

ইরান দক্ষিণ উপকূলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল না করার জন্য কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথটি দিয়েই বিশ্বজুড়ে পরিবাহিত হয়। এই পথটি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শেয়ারবাজারের অস্থিরতা

সোমবার লেনদেনের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুটি শেয়ারবাজার সূচক কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। তবে দিনের মাঝামাঝি সময়ে নাসডাক (Nasdaq) এবং S&P 500 তাদের প্রাথমিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় এবং সামান্য লাভে লেনদেন শেষ করে।

লন্ডনের FTSE 100 সূচক ১.২% পতন নিয়ে বন্ধ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া বার্কলেস, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং এইচএসবিসি-র মতো বড় ব্যাংকগুলোর শেয়ারের দামও কমেছে। বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা, জ্বালানির দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে, যার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে।

অন্যদিকে, ফ্রান্সের CAC-40 সূচক ২.২% এবং জার্মানির Dax সূচক ২.৬% পতন নিয়ে দিন শেষ করেছে। তবে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম ছিল চড়া।

জ্বালানি স্থাপনায় হামলা ও উৎপাদন বন্ধ

কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে আসা একটি ড্রোন দেশটির রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির একটি স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। এর পরপরই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘কাতারএনার্জি’ তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে। এছাড়া রাজধানী দোহার দক্ষিণে মেসাইদ এলাকায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির ট্যাংকেও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।

প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরবের উপকূলে অবস্থিত বিখ্যাত রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা হওয়ায় সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘আরামকো’।

হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা

অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালীর প্রবেশপথে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (UKMTO) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত দুটি জাহাজে সরাসরি হামলা হয়েছে এবং তৃতীয় একটি জাহাজের খুব কাছে একটি ‘অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল’ বিস্ফোরিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

এমএসটি মার্কি (MST Marquee)-এর জ্বালানি গবেষণা প্রধান সাউল কাভোনিক বিবিসি-কে বলেন, ‘বাজার এখনই পুরোপুরি আতঙ্কিত নয়। কারণ এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই তেল পরিবহন বা মূল উৎপাদন অবকাঠামোকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করেনি।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা গেলেই তেলের দাম আবার কমতে শুরু করবে।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, যদি এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তবে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি (দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি) এবং ব্যাংক সুদের হারের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দুবাই-ভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘কামার এনার্জি’-র প্রধান এবং শেল-এর সাবেক নির্বাহী রবিন মিলস বলেন, ‘তেল ব্যবসায়ীরা সারাক্ষণ খবরের ওপর নজর রাখছেন, তাই যুদ্ধের খবরের সাথে সাথেই তেলের দাম বেড়ে যাবে।’ তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন যে, “বর্তমান তেলের দাম দুই বছর আগের তুলনায় এখনও কম, তাই আমরা এখনও ‘পুরোপুরি তেল সংকটের’ পর্যায়ে পৌঁছাইনি।”

ওপেক+ (OPEC+) ও সরবরাহ পরিস্থিতি

গত রোববার তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ‘ওপেক প্লাস’ তেলের দামের উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল অতিরিক্ত তেল উত্তোলনের বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজারের অস্থিরতা কমাতে এই সামান্য পরিমাণ উৎপাদন বৃদ্ধি খুব একটা কাজে আসবে না।

যুক্তরাজ্যের অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (AA)-এর প্রেসিডেন্ট এডমন্ড কিং সতর্ক করেছেন যে, এই ডামাডোল বিশ্বজুড়ে পেট্রোলের দাম বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে বোমাবর্ষণ এবং অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করবে, যা অনিবার্যভাবে তেলের দাম বাড়াবে।’ সাধারণ মানুষের জন্য পাম্পে তেলের দাম কতটা বাড়বে এবং তা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধ কতদিন চলবে তার ওপর।

মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হার

সারাসিন অ্যান্ড পার্টনার্স-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ সুবিথা সুব্রামানিয়াম সতর্ক করে বলেন, যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে চড়া থাকে, তবে এর প্রভাব খাদ্যদ্রব্য, কৃষি এবং শিল্পপণ্যের ওপরও পড়বে। এটি সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর মুদ্রাস্ফীতির বোঝা বাড়িয়ে দেবে।

যুক্তরাজ্যে গত কয়েক মাস ধরে মুদ্রাস্ফীতির গতি কমছিল এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সুব্রামানিয়াম মনে করছেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ হয়তো সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা বাতিল করে তা ৩.৭৫ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখতে পারে।

জলপথে অস্থিরতা : জাহাজ চলাচল বন্ধ ও হামলার খবর

গত রোববার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করেছে যে, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি তেল ট্যাঙ্কার তাদের ‘ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছে এবং বর্তমানে সেগুলো জ্বলছে’। তবে এই দাবির বিষয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (UKMTO) জানিয়েছে যে, আরব উপসাগর এবং ওমান উপসাগরজুড়ে ‘একাধিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা’ রিপোর্ট করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংস্থাটি ওই অঞ্চলে চলাচলরত জাহাজগুলোকে ‘অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ট্রানজিট’ করার পরামর্শ দিয়েছে।

অন্যদিকে, শিপ-ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ‘কেপলার’ (Kpler)-এর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৫০টি তেল ট্যাঙ্কার বর্তমানে হরমুজ প্রণালীর বাইরে খোলা সমুদ্রে নোঙর করে আছে। যদিও আজ (সোমবার) হাতেগোনা কয়েকটি ইরানি এবং চীনা জাহাজ এই পথ দিয়ে পার হয়েছে, তবে সাধারণ জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ। কেপলার-এর বিশ্লেষক হোমায়ুন ফালাকশাহি বিবিসি নিউজকে বলেন, ‘ইরানের হুমকির কারণে (হরমুজ) প্রণালীটি কার্যত এখন বন্ধ হয়ে আছে।’

বিশ্বের বৃহত্তম কন্টেইনার শিপিং গ্রুপ ‘মায়েরস্ক’ (Maersk) রোববার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা আপাতত বাব এল-মান্দেব প্রণালী এবং সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থগিত রাখবে। এর পরিবর্তে তারা তাদের জাহাজগুলোকে আফ্রিকার ‘কেপ অফ গুড হোপ’ (উত্তমাশা অন্তরীপ) দিয়ে ঘুরে যাওয়ার জন্য নতুন রুট নির্ধারণ করেছে। এর ফলে জাহাজগুলোর গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক বেশি সময় এবং খরচ বাড়বে।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ঝুঁকির আশঙ্কা

বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় ২০১৮ সাল থেকে কাতারের এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। সম্প্রতি কাতারের প্রধান জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন হামলার পর উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের মোট আমদানিকৃত এলএনজির প্রায় ৪২ শতাংশ আসে কাতার থেকে। ২০১৭ সালে সই হওয়া ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতি বছর ৪০ কার্গো এলএনজি সরবরাহ করে কাতার এনার্জি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনার মধ্যে কাতার থেকেই আসার কথা ৪০ কার্গো। জানুয়ারি পর্যন্ত কাতার থেকে ২৪টি কার্গো দেশে পৌঁছেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম সতর্ক করেছেন যে, কাতারের উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে বাংলাদেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যার ফলে বড় ধরনের লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

সরকার ও পেট্রোবাংলার প্রস্তুতি

জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, মার্চের জন্য নির্ধারিত ১১টি কার্গোর মধ্যে ৯টি ইতিমধ্যেই সংঘাতপূর্ণ এলাকা পার হয়ে এসেছে। পেট্রোবাংলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছে এবং ঘাটতি মেটাতে বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা করছে।

সূত্র : বিবিসি

এনএনবাংলা/পিএইচ