




মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তির ১৪ দফা খসড়া প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
খসড়ায় যুদ্ধবিরতি, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির বিষয় উঠে এসেছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে তারা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) খসড়া কপি পেয়েছে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে উপস্থিত এক কূটনীতিক এবং আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুই কূটনৈতিক সূত্র নথিটির সত্যতা নিশ্চিত করেছে। তবে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ফাঁস হওয়া এই নথি চূড়ান্ত সমঝোতার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত রোববার ডিজিটালভাবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পর চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্নের জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা কার্যকর হবে।
খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানির অনুমতি দেবে। একই সঙ্গে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করলে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন তহবিলে প্রবেশাধিকার পেতে পারে। তবে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
১৪ দফা সমঝোতা চুক্তিতে যা রয়েছে—
১. তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি: ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা চুক্তিতে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করবে। উভয় পক্ষ শত্রুতামূলক কার্যক্রম ও শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকবে।
২. সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান: দুই দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
৩. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি: উভয় পক্ষ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আলোচনা চালিয়ে যাবে।
৪. নৌ অবরোধ প্রত্যাহার: চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন বাহিনী আশপাশের এলাকা থেকে প্রত্যাহার করা হবে।
৫. জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা: ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
৬. ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন পরিকল্পনা: যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সমন্বিত অর্থায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।
৭. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: চূড়ান্ত চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর জাতিসংঘ, আইএইএ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে।
৮. পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির প্রতিশ্রুতি: ইরান পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।
৯. বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা: চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক উপস্থিতি বাড়াবে না।
১০. তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির অনুমতি: যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন সেবার রপ্তানি অনুমোদন করবে।
১১. স্থগিত সম্পদ ও তহবিল মুক্ত করা: আলোচনায় অগ্রগতির ভিত্তিতে ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ ও তহবিল ধাপে ধাপে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে।
১২. বাস্তবায়ন কাঠামো গঠন: চুক্তির সফল বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি তদারকির জন্য একটি যৌথ কাঠামো গঠন করা হবে।
১৩. পরবর্তী ধাপের আলোচনা: ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারার বাস্তবায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর বাকি ধারাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনায় বসবে দুই দেশ।
১৪. জাতিসংঘের অনুমোদন: চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি?
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে এবং ইরানের অর্থনীতি নতুন গতি পেতে পারে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে এখনও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সমাধান বাকি রয়েছে।
এনএনবাংলা/
Tags: Iran US 14 Point DealIran US Agreementইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন