




সাধারণ মানুষের করের চাপ কমানো, কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং বেসরকারি উচ্চশিক্ষার প্রসারে একাধিক জনবান্ধব সংশোধনী প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
সোমবার জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, বরং এটি একটি জাতি পুনর্গঠনের বাজেট। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার ও বিরোধী দলসহ সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার অতীতের স্বৈরাচারী শাসনের কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। বিশেষ করে পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের সময় পুঁজিবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অসংখ্য মানুষ চরম হতাশায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল, যা বিশ্বের অন্য কোথাও নজিরবিহীন। তিনি জানান, সরকার পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে এবং যোগ্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে শিগগিরই ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেও জানান তিনি।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে জানান, ইতোমধ্যে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ১৫টির বেশি ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬০টিরও বেশি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব সম্পদ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ, হয়রানি কমানো এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই সরকারের লক্ষ্য। এ জন্য এমন একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে করদাতারা উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে গর্বের সঙ্গে কর পরিশোধ করবেন।
এ সময় ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ কর বছরের জন্য প্রস্তাবিত ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার পরিবর্তে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা উচিত। পাশাপাশি ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ কর বছরে তা সাড়ে ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ কর বছরে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাবও দেন তিনি।
জমি রেজিস্ট্রেশনে প্রকৃত মূল্য ও মৌজা মূল্যের জটিলতা দূর করতে বাজেটে আনা বিশেষ বিধান নিয়ে জনমনে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে—এমন বিভ্রান্তির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জনগণের মতামতের প্রতি সম্মান জানিয়ে ওই প্রস্তাবিত বিধান সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো, ভাষা শিক্ষা ল্যাব স্থাপন এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
এ ছাড়া ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন এবং সম্পত্তি মিউটেশনের ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করায় সেটিও প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তিন পার্বত্য জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আয় ছাড়াও পাহাড়ি ও সমতল অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত চাকরিজীবীদের বেতনভোগী আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি।
তরুণ উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বাজেটে প্রথমবারের মতো ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপনের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করারও প্রস্তাব দেন তিনি, যাতে ব্যবসায়ীরা বৈধ চ্যানেলে অর্থ পরিশোধে উৎসাহিত হন এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়ে।
দেশীয় শিল্পের বিকাশে একাধিক শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাবও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। চিংড়ি চাষের জন্য প্রয়োজনীয় একিউফিড, ফিড অ্যাডিটিভস, প্রোবায়োটিকস, ভিটামিন ও মিনারেল আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা, ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত মধুর ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং পিভিসি ও পেট রেজিন আমদানির শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন।
এ ছাড়া ফায়ার ডোর উৎপাদনের কাঁচামাল কোল্ড রোল্ড শিটের রেগুলেটরি শুল্ক, ফ্ল্যাট রোল্ড পণ্যের আগাম কর, বৈদ্যুতিক তার উৎপাদনে ব্যবহৃত রিফাইন কপারের রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার এবং ক্যাশনাট প্রসেসিং শিল্পে ব্যবহৃত অপ্রক্রিয়াজাত বাদামের কাস্টমস শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার আহ্বান জানান।
স্থানীয়ভাবে এলইডি ল্যাম্প ও প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড ভবন নির্মাণ শিল্পের কাঁচামাল আমদানির রেয়াতি সুবিধা ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানোরও প্রস্তাব দেন তিনি। একই সঙ্গে স্বর্ণ, হীরা ও রূপার অলংকারের ভ্যাট পুনর্নির্ধারণ, বিটিআরসির রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং মাছ সরবরাহের জোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন। রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রচারণায় বহুল ব্যবহৃত ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাস স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করারও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার সম্পদে নয়, বরং জনগণের আস্থায় নিহিত। বিচার বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সুপ্রিম কোর্টকে অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা এবং আইন মন্ত্রণালয়কে আরও ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
দক্ষ, সৎ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত জনপ্রশাসন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বক্তব্যের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিরোধীদলীয় নেতার জনবান্ধব প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশবান্ধব ও স্বল্প আয়ের মানুষের বাহন হিসেবে পরিচিত সাইকেলের ওপর সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অর্থমন্ত্রীকে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে জুলাই সনদকে সামনে রেখে সংবিধান সংশোধনসহ দেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণে সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।
এনএনবাংলা/পিএইচ
Tags: তারেক রহমানপ্রধানমন্ত্রী
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন