




হরমুজ প্রণালীতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর মঙ্গলবার ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটন বলছে, বাণিজ্যিক নৌপরিবহনে হামলার জবাব হিসেবেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানের চলমান প্রচেষ্টার মধ্যেই এই হামলা নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই ‘শক্তিশালী’ হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপরিবহনে হামলার জন্য ইরানকে ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালীর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কেশম দ্বীপে ছয়টি, সিরিক শহরে সাতটি এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসেও কয়েকটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারক বারবার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তেহরান।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘চুক্তি লঙ্ঘনের পরিণতি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর সতর্কবার্তা দিচ্ছে ইরান। নিজেদের স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় দেশটি দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে।’
ইরানের তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সাময়িক সুবিধা প্রত্যাহারের পরপরই এই হামলা চালানো হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনায় থাকা তেহরানের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জুন মাসে দেওয়া একটি লাইসেন্স বাতিল করেছে। ওই লাইসেন্সের আওতায় ইরান আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদন, বিক্রি এবং সরবরাহের অনুমতি পেয়েছিল।
এএফপিকে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এর পরিণতি তাদের ভোগ করতে হবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক পুরোপুরি বাস্তবায়ননির্ভর এবং তেহরান ‘ভালো আচরণ’ দেখালেই কেবল এর সুফল পাবে। তবে তিনি দাবি করেন, চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে মার্কিন আলোচকরা এখনও ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ কাজ করে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, রাতে একটি ট্যাংকারে ‘অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র’ আঘাত হানলে তাতে আগুন ধরে যায়। পরে আরও দুটি জাহাজে হামলা হয়, যার অন্তত একটিতে ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনটি জাহাজই ওমানের উপকূলসংলগ্ন এলাকায় আক্রান্ত হয়। এর আগে ওমান নিজ উপকূলঘেঁষা একটি অস্থায়ী নৌপথ ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায়ের চেষ্টা করা ইরান সেই উদ্যোগের বিরোধিতা করে।
কাতার জানিয়েছে, হামলার শিকার জাহাজগুলোর একটি ছিল তাদের এলএনজি ট্যাংকার ‘আল-রেকাইয়াত’। এ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে দোহা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের ওপর এটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হামলা হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।
ঘটনার পর কাতারে নিযুক্ত ইরানের উপ-রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানো হয়। পাশাপাশি ঘটনার ব্যাখ্যা দাবি করা হয় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে এমন সব কর্মকাণ্ড ‘অবিলম্বে বন্ধ’ করার আহ্বান জানানো হয়।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এক্সে লিখেছেন, ‘এই হামলা এবং এর ফলে হওয়া সব ক্ষয়ক্ষতি ও পরিণতির জন্য আমরা আইনত সম্পূর্ণভাবে ইরানকেই দায়ী করি।’
তবে কাতারের অভিযোগকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে ইরান। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
হরমুজ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা
এক সপ্তাহের বেশি সময়ের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে সাম্প্রতিক হামলাগুলো আবারও হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর ইরান এই প্রণালীতে আরোপিত অবরোধ তুলে নিয়েছিল।
নতুন এই ঘটনার পর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগ এএফপিকে বলেন, ‘আমরা এখন এমন এক সংবেদনশীল সময়ে রয়েছি, যখন ইরানের টোল বা ফি ব্যবস্থার বিকল্প কী হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।’
তার ভাষায়, ‘ইরান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, কোনো বিকল্পই তারা মেনে নেবে না।’
ক্রিগের মতে, ইরানের কাছে নিবন্ধন না করে ওমানের প্রস্তাবিত নৌপথ ব্যবহার করতে চাইলে ট্যাংকারগুলোকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। তিনি এই হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনের ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেন।
গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ধীরে ধীরে হরমুজ প্রণালীতে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। তবে ইরান আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতিতে আর ফেরা হবে না এবং আগের মতো অবাধে জাহাজ চলাচলের সুযোগও থাকবে না।
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর তীরবর্তী দেশ ইরান ও ওমানকে উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবার কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান যখন উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নজিরবিহীন আকাশ হামলা চালায়, তখন মধ্যস্থতায় রাজি হয়নি কাতার। তবে পরবর্তী সময়ে দোহা আরও সক্রিয় ভূমিকা নেয় এবং গত সপ্তাহে কাতারের উদ্যোগেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার আয়োজন করা হয়।
এনএনবাংলা/
Tags: ইরানতেহরানমার্কিন হামলাযুক্তরাষ্ট্রহরমুজ প্রণালী
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন