




আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড ফুটবল মাঠে মুখোমুখি হলেই পুরোনো ইতিহাস, যুদ্ধ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং আবেগের এক জটিল অধ্যায় সামনে চলে আসে। চলমান ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দুই দলের লড়াই ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে চার দশক আগের ফকল্যান্ড যুদ্ধ।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচ আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত লড়াই। দিয়েগো ম্যারাডোনার চার মিনিটের ব্যবধানে করা দুটি গোল—‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’—শুধু ম্যাচের ফলই বদলায়নি, বরং দুই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনাকেও নতুন মাত্রা দিয়েছিল।
পরে নিজের আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা লিখেছিলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই জয় তাদের কাছে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের এক ধরনের প্রতিশোধের প্রতীক ছিল।
ফকল্যান্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ
দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের বিরোধ বহু পুরোনো। আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরের এই দ্বীপপুঞ্জকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে বুয়েনস এইরেস। অন্যদিকে ১৮৩৩ সাল থেকে সেখানে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে ব্রিটেন।
দ্বীপটির বর্তমান বাসিন্দাদের অধিকাংশই ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত। ব্রিটেনের দাবি, স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হওয়া উচিত। বিপরীতে আর্জেন্টিনা মনে করে, ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক কারণে ফকল্যান্ড তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ।
এই বিরোধই ১৯৮২ সালে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধে রূপ নেয়। ৭৪ দিনব্যাপী সেই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জয় পায় ব্রিটেন।
গণভোট নিয়েও দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন
২০১৩ সালে ফকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে থাকার পক্ষে মত দেন। তবে আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই ওই গণভোটকে স্বীকৃতি দেয়নি।
সম্প্রতি আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কির্নো দেশটির একটি দৈনিকে প্রকাশিত নিবন্ধে ফকল্যান্ড ইস্যুতে সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধানের আহ্বান জানান।
তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন কোনো ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সার্বভৌমত্বের ভিত্তি হয়ে যায় না। আর্জেন্টিনার মতে, আলোচনার মাধ্যমেই ফকল্যান্ড ইস্যুর সমাধান হওয়া উচিত।
ফুটবল সমর্থকদের আবেগেও ‘মালভিনাস’
আর্জেন্টিনায় ফকল্যান্ড ‘মালভিনাস’ নামে পরিচিত এবং বিষয়টি দেশটির মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের ‘মালভিনাসের জন্য’ বিশ্বকাপ জয়ের কথা বলতে দেখা যায়।
দেশটির রাজনীতিতেও ফকল্যান্ড ইস্যু দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সরকারই এই দ্বীপপুঞ্জের ওপর নিজেদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে এসেছে।
নতুন করে উত্তাপ কেন?
সাম্প্রতিক সময়ে ফকল্যান্ড ইস্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি আবারও গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। আর্জেন্টিনার বর্তমান নেতৃত্বও এ বিষয়ে আগের মতোই কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে।
অন্যদিকে ব্রিটেন বরাবরের মতোই বলছে, ফকল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন সেখানকার বাসিন্দারাই।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াই তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। মাঠে লিওনেল মেসি ও হ্যারি কেনদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি গ্যালারিতেও ফিরে আসবে ইতিহাস, যুদ্ধ এবং বহু পুরোনো আবেগের স্মৃতি। ফুটবল আবারও দুই দেশের সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর অধ্যায়কে সামনে নিয়ে এসেছে।
এনএনবাংলা/
Tags: Argentina vs EnglandFalklands WarWorld Cup 2026আর্জেন্টিনাইংল্যান্ডফকল্যান্ড যুদ্ধমালভিনাস
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন