শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকটে ব্যাহত চিকিৎসা সেবা
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকটসহ নানা সমস্যায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে নেই গাইনি ও অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ। টেকনোলজিস্ট ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় পড়ে আছে এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন। একই কারণে ইসিজি সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অন্যান্য সহায়ক জনবল না থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২২০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৫৩ জন। শূন্য রয়েছে ৬৭টি পদ। ১২ জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। ২৯টি মেডিকেল অফিসার ও সহকারী সার্জনের পদের বিপরীতে আছেন ১২ জন। ৩৩টি নার্সের পদে ৩৩ জনই কর্মরত থাকলেও ১২টি এসএসিএমও পদের বিপরীতে আছেন মাত্র সাতজন।
হাসপাতালে নেই রেডিওগ্রাফার, ফিজিওথেরাপিস্ট ও কার্ডিওগ্রাফার। জুনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (ফিজিক্যাল মেডিসিন) এবং একাধিক মেডিকেল অফিসার ও সহকারী সার্জনের পদও শূন্য রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে এক্স-রে মেশিন থাকলেও রেডিওগ্রাফার বা সংশ্লিষ্ট টেকনিশিয়ান না থাকায় রোগীরা এ সেবা পাচ্ছেন না। একইভাবে সনোলজিস্ট না থাকায় আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন পড়ে আছে। টেকনিশিয়ান সংকটে ইসিজি সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা শহরের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০১২ সালের ৩১ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়েই ৫০ শয্যার কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর প্রায় ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও ৫০ শয্যার উপযোগী নতুন জনবল কাঠামো তৈরি হয়নি। ফলে বর্তমানে কাগজে-কলমে ৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও প্রয়োজনীয় জনবলের দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটি এখনো অনেকটাই ৩১ শয্যার কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
মঙ্গলবার সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। ৫০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৫৬ জন রোগী। নির্ধারিত শয্যার বাইরে অতিরিক্ত রোগীদের বারান্দায় বেড ও ফ্লোরিং করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালটিতে প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। জরুরি বিভাগে আসেন ১২০ থেকে ১৪০ জন। আর প্রতিদিন গড়ে ৫৫ থেকে ৬৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকেন।
চিকিৎসা নিতে আসা পরেশ কাহার বলেন, “আমার স্ত্রী তিন মাসের গর্ভবতী। গাইনি ডাক্তার দেখানোর জন্য হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলাম। এখানে গাইনি ডাক্তার নেই। এখন শহরে গিয়ে বেসরকারিভাবে দেখাতে হবে। আমরা গরিব মানুষ, প্রাইভেটে চিকিৎসা করানো আমাদের জন্য কঠিন।”
রুবিনা আক্তার বলেন, “আমার বোনকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছি। অনেক ভিড়, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে আমার বোন আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে।”
কবির মিয়া নামে এক রোগী বলেন, “কয়েক দিন আগে হাসপাতালে ডাক্তার এক্স-রে করতে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখানে এক্স-রে করা যায়নি। শহরে গিয়ে এক্স-রে করে রিপোর্ট নিয়ে আসতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে এই সুবিধা চালু থাকলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হতো।”
হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডের ইনচার্জ হাসিনা আক্তার বলেন, প্রতিদিনই গর্ভবতী নারীরা হাসপাতালে আসেন। গাইনি চিকিৎসক না থাকায় তাদের চিকিৎসাসেবা দিতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তবে হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসব ভালোভাবেই হচ্ছে। চলতি মাসে প্রায় ১৫০টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। যেসব রোগীর অস্ত্রোপচার বা সিজারিয়ান প্রসবের প্রয়োজন হয়, তাদের অন্যত্র রেফার করতে হয়। বিশেষ করে চা-বাগান এলাকার দরিদ্র রোগীদের জন্য বিষয়টি কষ্টকর।
হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অভিজিৎ বণিক বলেন, “এখানে প্রতিদিন প্রচুর পরীক্ষা হয়। জনবল না থাকায় আমি একাই রক্ত সংগ্রহ, নমুনা প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষা ও রিপোর্ট দেওয়ার কাজ করি। এতে কাজের ওপর অনেক চাপ পড়ে এবং সেবায় বিঘ্ন ঘটে। পর্যাপ্ত জনবল থাকলে কাজ করা অনেক সহজ হতো।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাবে হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে মাত্র দুজন ক্লিনার দিয়ে এত বড় হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে আইপিএসের ব্যাটারি ও জেনারেটরে জ্বালানি সংকটের কারণেও বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হাসপাতালের প্রয়োজনের তুলনায় কিছু ওষুধ ও খাবার সরবরাহও অপ্রতুল বলে জানা গেছে। ব্লাড ব্যাংক না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের বাইরে থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, “হাসপাতাল পরিচালনার জন্য যে জনবল প্রয়োজন, তা পর্যাপ্ত না থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গাইনি ও অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকা। তাদের না থাকায় প্রসূতি মায়েদের সেবা দিতে বেশি সমস্যা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “হাসপাতালে এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন রয়েছে, কিন্তু সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লোক নেই। ফলে রোগীদের এসব সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন ৫৫ থেকে ৬৫ জন রোগী ভর্তি থাকেন। অতিরিক্ত রোগীদের আলাদা ব্যবস্থা করে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। মাত্র দুজন ক্লিনার দিয়ে এত বড় হাসপাতাল পরিচালনা করা কঠিন।”
ডা. সিনথিয়া তাসমিন আরও বলেন, “এত সংকটের মধ্যেও আমরা চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছি। পর্যাপ্ত জনবল পাওয়া গেলে রোগীদের আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। জনবল চেয়ে আমরা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। তবে এখনো প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া যায়নি।”
স্থানীয়দের দাবি, শ্রীমঙ্গল একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও চা-বাগান অধ্যুষিত উপজেলা হওয়ায় এখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির ওপর বিপুলসংখ্যক মানুষ নির্ভরশীল। তাই দ্রুত শূন্য পদগুলোতে জনবল নিয়োগ এবং অচল যন্ত্রপাতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এনএনবাংলা/
