Skip to content

Upcoming
Norway
0-0
England
Source: ESPN

টানা তৃতীয় বছরের মতো ‘কোরবানির ঈদ’ নেই ফিলিস্তিনের গাজায়

ছবি: সংগৃহীত

ইসরাইলের অব্যাহত হামলা, কঠোর অবরোধ ও বারবার বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজা উপত্যকার গবাদিপশু খাত প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে টানা তৃতীয় বছরের মতো ঈদুল আজহায় কোরবানি দিতে পারছেন না গাজার অধিকাংশ মানুষ। ধর্মীয় ও সামাজিক এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ধীরে ধীরে গাজাবাসীর জীবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মিডল ইস্ট আই।

যুদ্ধ শুরুর আগে গাজা সিটির অন্যতম বড় গবাদিপশু খামারি ছিলেন মাজেন আল-জেরজাউই। প্রতি ঈদে শত শত ভেড়া ও গরু বিক্রির প্রস্তুতি নিতেন তিনি। তবে এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। বর্তমানে তিনি একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালান, যেখানে ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কোনোমতে প্রবেশ করা ফ্রোজেন মাংসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে জেরজাউই বলেন, আগে এই সময়ে তিনি প্রায় ২০০টি গরু ও ভেড়া বিক্রি করতেন। অথচ এখন তার কাছে একটি পশুও নেই। ইসরাইল গাজায় কোনো জীবন্ত পশু প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। গাজার মানুষকে এমনভাবে দেখা হচ্ছে যেন তারা সাময়িকভাবে এখানে বসবাস করছে এবং বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিসই শুধু সরবরাহ করা হচ্ছে।

ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের আগে প্রতি বছর গাজায় প্রায় ৪০ থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি করা হতো। কিন্তু আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

গাজা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলা এবং পশুখাদ্য ও কৃষি সরঞ্জামের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে গাজার ৯০ শতাংশের বেশি গবাদিপশু খাত ধ্বংস হয়ে গেছে।

পশুর সংকটে বাজারে দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। যুদ্ধের আগে একটি ভেড়ার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার। বর্তমানে একই ভেড়া কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার ডলার বা প্রায় ২০ হাজার শেকেল।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে জেরজাউই প্রবাসীদের উদ্দেশে বলেন, কোরবানির জন্য অর্থ ব্যয় না করে সেই টাকা দিয়ে ফ্রোজেন মাংস কিনে পরিবার-স্বজনদের সহায়তা করা এখন বেশি প্রয়োজন।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতেই গাজার ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল মারা গেছে। একই সঙ্গে খামার, গোয়ালঘর, পশুখাদ্যের গুদাম ও ভেটেরিনারি ক্লিনিকও ধ্বংস হয়ে গেছে।

খামারিদের অভিযোগ, বোমাবর্ষণে অসংখ্য পশু মারা যাওয়ার পাশাপাশি বারবার এলাকা ছাড়ার নির্দেশের কারণে বেঁচে থাকা পশুগুলোও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অনেকেই বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় অল্প দামে কিংবা খাবার কেনার জন্য বাধ্য হয়ে পশু বিক্রি করে দিয়েছেন।

গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে গাজায় যেখানে প্রায় ৬০ হাজার ভেড়া ও ছাগল ছিল, বর্তমানে তা কমে মাত্র ৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে। গরু ও বাছুর প্রায় পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে যেসব পশু টিকে আছে, সেগুলো যাযাবর রাখালদের কাছে রয়েছে এবং বিক্রির জন্য নয়।

তিনি আরও জানান, পানি তোলার পাম্প ও কূপগুলো অচল হয়ে পড়ায় এই খাত পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনাও প্রায় নেই।

কোরবানির অনুপস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, গাজার সামাজিক ও মানসিক জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। গাজা সিটির স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা বলেন, টানা তিন বছর ধরে তারা কোনো ঈদের আনন্দ অনুভব করতে পারছেন না। কোরবানির আনন্দ এবং তা সবার মাঝে ভাগ করে নেওয়ার অনুভূতি পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।

তিনি জানান, গাজার অধিকাংশ পরিবারের এখন তিন বেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ফ্রোজেন মাংসও খেতে পারেননি।

জাতিসংঘ সমর্থিত আইপিসি মূল্যায়ন অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১৬ লাখ মানুষ বর্তমানে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যুদ্ধবিরতি থাকলেও মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্যের ওপর ইসরাইলের কঠোর ও অনিয়মিত নিষেধাজ্ঞা সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গবাদিপশু খাতের এই ধ্বংস শুধু ঈদ উদযাপনকেই বন্ধ করেনি, বরং পশুচিকিৎসক, খামারি, কসাই ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীসহ পুরো একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অচল করে দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গাজাকে পরনির্ভরশীল করে রাখতেই পরিকল্পিতভাবে এই অবরোধ বজায় রাখা হচ্ছে।

এনএনবাংলা/