




যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং তা ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ-এ অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলনে অংশগ্রহণের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। একই নথিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও স্বাক্ষর করেছেন বলে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে।
১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারকে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে না। পাশাপাশি দেশটির পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অর্থায়নের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরুর চার মাস পর এই সমঝোতা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি পারফরম্যান্সভিত্তিক চুক্তি। অর্থাৎ, ইরান প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করলেই কেবল চুক্তির সুবিধা ভোগ করতে পারবে।
যদিও সমঝোতার অনেক বিষয় এখনও চূড়ান্ত নয় এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত রয়েছে, তবুও ১৪ দফার মূল বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো—
প্রথম দফা: সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান
চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, লেবাননে হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এই সমঝোতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অন্যদিকে, তেহরানও দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছিল।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে, লেবাননে ইসরায়েলের যেকোনো নতুন সামরিক অভিযান এই সমঝোতার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া কোনো পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করবে না কিংবা হুমকি দেবে না। লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতিও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়।
দ্বিতীয় দফা: অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখাবে এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারা ইরানের সরকারবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ চলতি বছরের শুরুতে বিক্ষোভ চলাকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “সহায়তা আসছে।”
তৃতীয় দফা: ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্য
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে দুই দেশ একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। উভয় পক্ষ সম্মত হলে এই সময়সীমা বাড়ানো যাবে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, জি৭ সম্মেলন শেষে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে আয়োজিত এক নৈশভোজে ট্রাম্প এই নথিতে স্বাক্ষর করেন। এর আগে জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের কথা বলা হলেও সেটি এখনও অনিশ্চিত।
চতুর্থ দফা: অবরোধ প্রত্যাহার
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা প্রত্যাহার শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণ করবে।
এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে নিজেদের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে সংঘাত শুরুর আগের অবস্থানে মার্কিন বাহিনী ফিরে যাবে।
পঞ্চম দফা: হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা
সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে কোনো ধরনের ফি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে।
যুদ্ধের কারণে প্রণালিটি বন্ধ হয়ে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গিয়েছিল। তাই এটি পুনরায় চালু করা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল।
মাইন অপসারণ ও অন্যান্য কারিগরি বাধা দূর করে দ্রুত জাহাজ চলাচল শুরু করা হবে। ভবিষ্যতে ওমান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ে প্রণালি পরিচালনার একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ষষ্ঠ দফা: ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই অর্থ দেবে না। বরং দেশটির অনুমোদনের মাধ্যমে অন্য দেশগুলো ইরানে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারবে।
সপ্তম দফা: অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের ওপর আরোপিত জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।
তবে এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এবং পরবর্তী আলোচনায় এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।
অষ্টম দফা: পারমাণবিক অস্ত্র নয়
ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এছাড়া সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবস্থাপনার বিষয়ে উভয় পক্ষ পরবর্তী আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেবে। ন্যূনতম পর্যায়ে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধকরণ মাত্রা কমানোর (ডাউনব্লেন্ড) ব্যবস্থা করা হবে।
এই শর্ত পূরণের ওপরই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি নির্ভর করবে।
নবম ও দশম দফা: স্থিতাবস্থা বজায় রাখা
চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উভয় দেশ একটি “স্থিতাবস্থা” বজায় রাখবে।
এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না এবং তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং লেনদেন ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দেবে।
একাদশ দফা: জব্দকৃত অর্থ ফেরত
ইরানের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী, দেশটির জব্দকৃত সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
তবে কীভাবে এবং কোন সময়ে এসব অর্থ মুক্ত করা হবে, তা পরবর্তী আলোচনায় নির্ধারণ করা হবে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে ধাপে ধাপে এই সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে।
দ্বাদশ থেকে চতুর্দশ দফা: নজরদারি ও চূড়ান্ত চুক্তি
শেষ তিনটি দফায় চুক্তি বাস্তবায়নের কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
সমঝোতা বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ চুক্তির শর্ত মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ ব্যবস্থা গঠন করা হবে।
এমওইউ কার্যকর হওয়ার পর উভয় দেশ পূর্ণাঙ্গ চুক্তির জন্য আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করবে। সবশেষে সেই চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
এনএনবাংলা/পিএইচ
Tags: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাযুদ্ধবিরতিস্মারকের ১৪ দফায়
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন