Skip to content

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধে ‘কৌশলগত পরাজয়ের’ মুখে যুক্তরাষ্ট্র, মিত্রদের উৎকণ্ঠা

ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে পিছিয়ে পড়ছে বলে দাবি করেছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

দীর্ঘ ছয় মাসের সামরিক অভিযান চালিয়েও তেহরানের বিরুদ্ধে ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে ওয়াশিংটন। সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও ইরানের আচরণ বা নীতিতে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে না পারায় যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থাকে দেশটির মিত্ররা কৌশলগত পরাজয়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে।

শুক্রবার প্রকাশিত মার্কিন সংবাদপত্রটির এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে সাবেক কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতির মুখে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির কাছে ওয়াশিংটনের দুর্বলতার বার্তা যেতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরার পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোর মধ্যে ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। সামরিক চাপ সত্ত্বেও ইরান এখনও আঞ্চলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সক্ষমতা বজায় রেখেছে।

বিশ্লেষণে হরমুজ প্রণালিকে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রণালিকে ঘিরে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা বর্তমান সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হরমুজের নিয়ন্ত্রণে তৃতীয় কোনো পক্ষের ভূমিকার বিরোধিতা করেছে তেহরান। ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় এই প্রণালিকে গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে পারে ইরান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ইরান তুলনামূলকভাবে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণকারী সরকারের অধীনে আগের চেয়ে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। দেশটির পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যকর প্রভাবও বজায় রেখেছে তেহরান। যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—উভয়ই তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে পড়েছে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য একে অপরকে দায়ী করছে বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে—এমন ধারণা আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও জোরালো হচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্র দেশের মধ্যে ওয়াশিংটনের নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ বিকল্প কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলেও একই সময়ে ইরান, ইউরোপ, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘায়িত যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যেও কৌশলগত মতপার্থক্য বেড়েছে। একই সঙ্গে ইরানের নেতৃত্ব ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো সমঝোতার স্থায়িত্ব নিয়েও সন্দিহান।

এদিকে ইউরোপীয় মিত্ররা ট্রাম্পের পূর্ববর্তী পররাষ্ট্রনীতি ও ন্যাটো-সংক্রান্ত অবস্থানের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রীনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। লন্ডনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চাথাম হাউজের সাবেক পরিচালক রবিন নিবলেটের মতে, এখন পর্যন্ত যুদ্ধের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

তার মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-নির্ভর মিত্রদের মধ্যে ওয়াশিংটনের প্রতি আস্থা কমাতে পারে। ভবিষ্যতে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এলেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যেতে পারে।

নিউইয়র্ক টাইমসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই দ্রুত চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনের অবস্থানে নেই। ফলে সংঘাতটি যুদ্ধবিরতি ও পুনরায় উত্তেজনা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি চক্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এনএনবাংলা/