আনিসুলের ১৭২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, ৭৩৭ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন

সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও তার তিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকার অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে চার্জশিট অনুমোদন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির সচিব মো. সাইদুর রহমান খান এ তথ্য জানান।
দুদকের তদন্তে আনিসুল হকের নিজ নামে ৯৬ কোটি ৮০ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮০ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি স্বজন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে আরও ৮৪ কোটি ৫ লাখ ৭ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে আনিসুল হকের নামে-বেনামে মোট ১৮০ কোটি ৮৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮৮১ টাকার সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। এর মধ্যে ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকার সম্পদকে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্বজনদের নামে ৮৪ কোটি টাকার সম্পদ
দুদকের তথ্যানুযায়ী, আনিসুল হকের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জেবুন্নেসা বেগম হকের নামে ২৩ কোটি ৩২ লাখ ২ হাজার ৩২১ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সিটিজেনস ব্যাংকের ১০ কোটি টাকার শেয়ার ও ১৩ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে।
তার ভাগিনা শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলামের নামে ২০ কোটি ৭১ লাখ ৮১ হাজার ৮৪৪ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া কথিত কাজিন মোহাম্মদ ইকবালের নামে ৪০ কোটি ১ লাখ ২৩ হাজার ২৩৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। এর বড় অংশই সিটিজেনস ব্যাংকের শেয়ারে রয়েছে। তিনজনের নামে থাকা এসব সম্পদের মোট মূল্য ৮৪ কোটি ৫ লাখ ৭ হাজার টাকা।
বৈধ আয় ১৩ কোটি, সম্পদ ১৮০ কোটি টাকা
তদন্তে আনিসুল হকের বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া গেছে ১৩ কোটি ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৮ টাকা। এর বিপরীতে পারিবারিক ব্যয় পাওয়া গেছে ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫৪ হাজার ২৯৮ টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বাদ দেওয়ার পর তার নিট সঞ্চয় থাকার কথা ৮ কোটি ৬১ লাখ ৪০ হাজার ৯৪০ টাকা।
দুদকের হিসাবে, এই আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকা সম্পদের পরিমাণ ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকা। স্বনামে ও বেনামে সম্পদ মিলিয়ে মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮০ কোটি ৮৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮৮১ টাকা।
২৩ ব্যাংক হিসাবে ৭৩৭ কোটি টাকার লেনদেন
অবৈধ সম্পদের পাশাপাশি আনিসুল হক ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ২৩টি ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্যও পেয়েছে দুদক। এসব হিসাবে মোট ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫২ টাকা জমা এবং ৩৬১ কোটি ৭৩ লাখ ২৭ হাজার ১২৯ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে লেনদেনের পরিমাণ ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকা। দুদক এসব লেনদেনকে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মামলায় চার আসামি
প্রাথমিক মামলায় আনিসুল হক একমাত্র আসামি থাকলেও তদন্ত শেষে চারজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। অন্য তিন আসামি হলেন আনিসুল হকের আত্মীয় ও বিএইচআইএস অ্যাপারেলসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল, ভাগিনা শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলাম এবং ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জেবুন্নেসা বেগম হক।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলায় তখন প্রায় ১৫০ কোটি টাকার সম্পদ ও ৭০০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
চার্জশিটে ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৭(১) ধারা, দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনিসুল হক ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট নৌপথে পালানোর সময় রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
এনএনবাংলা/
