দাউদকান্দিতে পাটের বাম্পার ফলন, ন্যায্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক
বর্ষা মৌসুম এলেই কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের ভেলানগর গ্রাম যেন সোনালি আঁশের এক কর্মচঞ্চল জনপদে পরিণত হয়। কোথাও জলাশয়ে পাট জাগ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও চলছে আঁশ ছাড়ানোর ব্যস্ততা, আবার কোথাও রোদে শুকানো হচ্ছে সদ্য ধোয়া পাট। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারী-পুরুষের নিরলস শ্রমে এগিয়ে চলছে দেশের ঐতিহ্যবাহী অর্থকরী ফসল পাট সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ।
ভালো ফলনের আনন্দ থাকলেও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা। তাদের অভিযোগ, এলাকায় বড় পাইকার বা ক্রেতার উপস্থিতি কম থাকায় উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য মিলছে না। এতে কয়েক মাসের শ্রম, উৎপাদন ব্যয় ও বিনিয়োগের যথাযথ প্রতিফল পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে ভেলানগর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কেউ ক্ষেত থেকে কাটা পাট জলাশয়ে জাগ দিচ্ছেন, কেউ পচা পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়ে পরিষ্কার করছেন, কেউ নৌকায় করে পাট পরিবহন করছেন, আবার কেউ রোদে শুকিয়ে আঁটি বেঁধে বাজারজাতের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পুরো গ্রামজুড়েই চলছে সোনালি আঁশ সংগ্রহের ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ এলাকায় প্রায় ৬৫ জন কৃষক বিস্তীর্ণ জমিতে পাট চাষ করেছেন। চৈত্র মাসে প্রথম বৃষ্টির পর জমিতে বীজ বপন করা হয়। এরপর নিয়মিত পরিচর্যা ও আগাছা দমন শেষে আষাঢ়ের শেষ দিকে পাট কেটে জলাশয়ে জাগ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময় পচনের পর আঁশ ছাড়িয়ে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে বাজারজাতের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
কৃষক ছাদিম আলী মোল্লা ও তার স্ত্রী দেলোয়ারা প্রতিনিধি সাইফুল ইসলামকে বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে পাট উৎপাদন করেছি। এখন যদি ন্যায্য দামে বিক্রি করতে না পারি, তাহলে এত পরিশ্রমের সুফল পাব না। ভালো পাইকার এলে আমরা ন্যায্য মূল্য পাব এবং পরিবারও স্বচ্ছলভাবে চলতে পারবে।’
কৃষক বিল্লাল মোল্লা বলেন, ‘এক কানি জমিতে পাট চাষ করেছি। এখন শুধু ভালো দামের অপেক্ষায় আছি।’
একই প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন আসাদ মোল্লা, মফিজ মোল্লা, আবু তাহের মোল্লা, লিটন ভূঁইয়া, নূরু মিয়া, শাহজাহান মোল্লাসহ আরও অনেক কৃষক। তাদের ভাষ্য, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য না পেলে ভবিষ্যতে পাট চাষে আগ্রহ কমে যেতে পারে।
কৃষক হাশেম মোল্লা ও তার স্ত্রী মোর্শেদা বলেন, ‘ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেছি। আল্লাহর রহমতে ফলন খুব ভালো হয়েছে। এখন ন্যায্যমূল্য না পেলে এই পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হবে না। আমাদের এলাকায় বড় পাইকার এলে একসঙ্গে ২০০ মণেরও বেশি পাট কেনা সম্ভব।’
তারা জানান, গত বছর প্রতি মণ পাট প্রায় তিন হাজার টাকায় বিক্রি হলেও উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিক মজুরি ও অন্যান্য খরচ বিবেচনায় প্রত্যাশিত লাভ হয়নি। কানি প্রতি চাষাবাদে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। তাই ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে আগামী প্রজন্মের অনেকেই পাট চাষ থেকে সরে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা তাদের।
একসময় দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস ছিল পাট। পরিবেশবান্ধব এ প্রাকৃতিক তন্তুর তৈরি বস্তা, ব্যাগ, কার্পেট, জিওটেক্সটাইলসহ বিভিন্ন পণ্যের দেশি-বিদেশি বাজারে চাহিদা আবারও বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় এ খাতের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে মাঠপর্যায়ে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুইবার জাতীয় কৃষি পদক ও জাতীয় পরিবেশ পদকপ্রাপ্ত এগ্রিকালচারাল ইম্পর্ট্যান্ট পারসন (এআইপি) অধ্যাপক মতিন সৈকত বলেন, ‘পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি পরিবেশবান্ধব অর্থকরী ফসল। প্লাস্টিক দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের এ সময়ে বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা আবারও বাড়ছে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে পাটচাষ সম্প্রসারিত হবে এবং দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ উভয়ই উপকৃত হবে।’
দাউদকান্দি পাট উন্নয়ন অধিদপ্তরের পাট উন্নয়ন সহকারী কর্মকর্তা সৈয়দ মোশারফ হোসেন বলেন, ‘সরকারিভাবে দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ উত্তর, পাঁচগাছিয়া, মারুকা, বিটেশ্বর ও পদুয়া ইউনিয়নের ৬০০ জন পাটচাষীর মধ্যে উন্নতমানের তোষা জাতের পাটের বীজ বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে উপজেলার সব এলাকায় পাটের ফলন ভালো হয়েছে। এর মধ্যে ইলিয়টগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের ভেলানগরে সবচেয়ে বেশি ফলন হয়েছে। কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পেলে আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে পাট চাষে উৎসাহিত হবেন।’
কৃষকদের দাবি, সরকারি পর্যায়ে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, সরাসরি ক্রয় কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বড় পাইকারদের মাঠপর্যায়ে সম্পৃক্ত করা হলে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমবে। একই সঙ্গে কৃষকের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত হবে এবং পাট চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষকবান্ধব বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দেশের ঐতিহ্যবাহী সোনালি আঁশ আবারও জাতীয় অর্থনীতি, রপ্তানি খাত এবং গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
এনএনবাংলা/
