দিল্লিতে নজিরবিহীন ছাত্র বিক্ষোভ, বলিউড তারকাদের সংহতি
ভারতে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, প্রশ্নফাঁস রোধ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সোমবার (২০ জুলাই) ‘লং মার্চ টু পার্লামেন্ট’ কর্মসূচি শুরু করে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। রাজধানী দিল্লির রাজপথে নামে লাখো মানুষের ঢল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থী, তরুণ ও সাধারণ মানুষের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে প্রধান সড়কগুলো।
বিক্ষোভকারীদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে কড়া নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ব্যারিকেড, জলকামান ও বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হলেও দফায় দফায় সংঘর্ষে কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয় দিল্লির বিভিন্ন এলাকা। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ভারতের রাজধানীজুড়ে। এই আন্দোলন ঘিরে একের পর এক মুখ খুলেছেন বলিউডের তারকারা।
চলমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পাঞ্জাবি গায়ক ও অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, সোমবার যা ঘটেছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, ছাত্রদের সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত নয় এবং প্রশাসনের উচিত তাদের দাবি মন দিয়ে শোনা। তিনি আরও বলেন, মানুষের কণ্ঠস্বরই আসলে ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর।
তবে একই পোস্টে দিলজিৎ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই অবস্থান নেওয়ার কারণে তাকে আবারও ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ বলা হতে পারে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, কৃষক আন্দোলনের সময় সমর্থন জানানোয় তাকে তীব্র সমালোচনা ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। যদিও সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। তার ভাষায়, সবকিছুই ঈশ্বর দেখছেন এবং তিনি সকলের মঙ্গল কামনা করেন।
অভিনেত্রী ভূমি পেডনেকর ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, “হিংসা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। আজ আমরা হিংসার ছবি দেখেছি। দেশের তরুণদের জন্য আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, এই আন্দোলন যেন হিংসার পথে না যায় কিংবা নিজের লক্ষ্য থেকে সরে না যায়। গণতন্ত্র সংলাপের মাধ্যমেই শক্তিশালী হয়। সমাজের দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ। সেই বিশ্বাস আমরা ভেঙে যেতে দিতে পারি না। আমি আশা করি, শেষ পর্যন্ত জয় হবে সেই শিক্ষার্থীদের, যারা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটির শিকার হয়েছে।”
এরপর তিনি আন্দোলনের নেপথ্যের কারণও তুলে ধরেন। ভূমির মতে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনও একাধিক ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি লেখেন, “প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা পরিচালনায় ব্যর্থতা, সমান সুযোগের অভাব, শিক্ষকের সংকট এবং শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ—এসব সমস্যার দিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। গত কয়েক বছরে ভারত উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।”
এদিকে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আয়োজিত আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে অভিনেত্রী স্বরা ভাস্করের স্বামী ও রাজনৈতিক কর্মী ফাহাদ আহমেদকে গ্রেপ্তার করেছে মুম্বাই পুলিশ। সোমবার (২০ জুলাই) মুম্বাইয়ের চৈত্যভূমি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে দাবি করেন স্বরা ভাস্কর।
জানা গেছে, চৈত্যভূমিতে আয়োজিত সমাবেশ থেকে পুলিশ তাকে আটক করে মাহিম থানায় নিয়ে যায়। সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও শেয়ার করে স্বরা ভাস্কর ঘটনাটিকে “গণতন্ত্রের জন্য লজ্জাজনক” বলে মন্তব্য করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, উপস্থিত অন্যান্য আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ফাহাদকেও পুলিশ গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, আন্দোলনের শুরু থেকেই সরব ছিলেন বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেত্রী শাবানা আজমি। আন্দোলনে যোগ দিতে গিয়ে আচমকাই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। প্রতিবাদ কর্মসূচির মাঝেই তার মাথা ঘুরতে শুরু করলে স্বেচ্ছাসেবী ও নিরাপত্তারক্ষীরা দ্রুত তাকে ভিড়ের মধ্য থেকে সরিয়ে নেন। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী শাবানাকে ধরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে বাতাস করছেন। পরে তিনি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেন।
এর আগে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শাবানা আজমি বলেন, “মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করছেন। আমরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতেই এখানে এসেছি। সংবিধান আমাদের সেই অধিকার দিয়েছে। মহাত্মা গান্ধী অহিংসার পথ দেখিয়েছেন। আমাদের কোনোভাবেই হিংসার পথে যাওয়ার ইচ্ছা নেই।”
এদিকে ছাত্র-যুবদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ খুলেছেন বলিউড অভিনেতা রীতেশ দেশমুখ। তিনি বলেন, দেশের তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বরকে দমিয়ে রাখা নয়, বরং তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসাই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
সোমবার রাতেই সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় রীতেশ লেখেন, “আমরা দেশের তরুণদের পাশে আছি। তাদের কণ্ঠস্বর যেন নির্ভয়ে, স্পষ্টভাবে এবং জোরালোভাবে শোনা যায়, সেটাই প্রয়োজন। তারাই আমাদের গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি এবং দেশের ভবিষ্যতের প্রকৃত নির্মাতা।”
তার মতে, শুধু আন্দোলন দমন করে কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি লেখেন, “তরুণদের কথা মন দিয়ে শুনুন, তাদের পাশে দাঁড়ান এবং তাদের শক্তিকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যান। আজকের যুব সমাজের সাহস, স্বপ্ন এবং উদ্যমই আগামী ভারতের ভিত্তি গড়ে তুলবে।” বার্তার শেষে তিনি ‘জয় হিন্দ’ লিখে নিজের বক্তব্য শেষ করেন।
এনএনবাংলা/
