Skip to content

বদির মেটিকুলাস ডিজাইনে হয় একরাম হত্যার ‘বন্দুকযুদ্ধের নাটক’

আদালতে আবদুর রহমান বদি। ফাইল ছবি সংগৃহীত

২০১৮ সালে টেকনাফ পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছে। এ ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির পরিকল্পনাতেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল বলে দাবি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

রোববার (২৬ জুলাই) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ চিফ প্রসিকিউটরের পক্ষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল পলাতক আট আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। একই সঙ্গে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকা তিন আসামিকে আদালতে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাদের একজন টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি।

আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রত্যক্ষদর্শী ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের এবং আবদুর রহমান বদিসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একরাম ছিলেন বদির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বা সুপরিকল্পিত ছকের মাধ্যমেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

তিনি আরও দাবি করেন, একরামকে হত্যার পর তার সম্পত্তি বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করা হয় এবং এ ঘটনার নেপথ্যেও আবদুর রহমান বদির ভূমিকা ছিল। এসব বিষয় তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে উঠে আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, অবসরপ্রাপ্ত মেজর রুহুল আমিন, সাবেক ডিজিএফআই কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশেকুর রহমান।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পরই তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গ্রহণের পাশাপাশি গ্রেপ্তার আসামিদের শোন অ্যারেস্ট এবং পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য আগামী ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রুহুল আমিন ও আশেকুর রহমান সরাসরি গুলি চালিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর মিফতাহ উদ্দিনসহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্যান্য র‌্যাব কর্মকর্তারা পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে ভূমিকা পালন করেন।

চিফ প্রসিকিউটর আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বিষয়টি যাতে আর না বাড়ে, সে জন্য একরামের স্ত্রীকে ডেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, তৎকালীন সরকার বিরোধী মতের ব্যক্তিদের বিভিন্নভাবে টার্গেট করে অপহরণ, গুম অথবা কথিত ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করত। একরাম হত্যা সেই ধারাবাহিকতারই একটি ঘটনা বলে দাবি করেন তিনি।

আমিনুল ইসলাম স্মরণ করিয়ে দেন, হত্যাকাণ্ডের সময় একরামের মোবাইল ফোন চালু ছিল। সে সময় তার স্ত্রী ও মেয়েরা ফোনের ওপাশে গুলির শব্দ এবং একরামের শেষ কথোপকথন শুনতে পেয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে র‌্যাবের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর একরামুল হক। সে সময় র‌্যাব এক বিজ্ঞপ্তিতে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী এবং ইয়াবা গডফাদার হিসেবে উল্লেখ করে।

তবে একরামের পরিবার দাবি করেছিল, ডিজিএফআইয়ের পরিচয়ে সাধারণ পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যান। পরে গভীর রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরবর্তীতে একরামের মৃত্যুর সময়কার অডিও প্রকাশের পর ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয় এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে।

উল্লেখ্য, একরামুল হককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার অভিযোগসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

এনএনবাংলা/