সাম্প্রতিক
Skip to content

গুলশান-১ গোলচত্বরে তিন বিঘা জমিতে ৪০ তলা ভবনের ছক এঁকেছে শান্তা হোল্ডিংস

গুলশান-১ গোলচত্বরে তিন বিঘা জমিতে ৪০ তলা ভবনের শান্তা হোল্ডিংসের বিলবোর্ড। ছবি: সংগৃহীত

গুলশান-১ গোলচত্বরের মূল্যবান প্রায় তিন বিঘা জমি সিনেমা হল নির্মাণের শর্তে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে গড়ে উঠেছিল ছয়তলা গুলশান শপিং সেন্টার। ভবনটি ভেঙে ফেলার পর এবার ওই জমিতে ৪০ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে শান্তা হোল্ডিংস। তবে জমির ব্যবহার, মালিকানা ও ব্যাংকঋণ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (বর্তমানে রাজউক) গুলশান-১-এর ১৪, ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লট ‘চলচ্চিত্র’ ও ‘বাণীচিত্র’ প্রতিষ্ঠানকে সিনেমা হল নির্মাণের শর্তে বরাদ্দ দেয়। পরবর্তী সময়ে রাজউকের অনুমতি নিয়ে সেখানে বাণিজ্যিক দোকান নির্মাণ করা হলেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি হলরুম রাখার শর্ত ছিল। কিন্তু গুলশান শপিং সেন্টার নির্মাণের সময় সেই শর্তও মানা হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আদালতের নির্দেশে ছয়তলা ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়।

২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জমির ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়ে শান্তা প্রপার্টিজকে (বর্তমানে শান্তা হোল্ডিংস) আমমোক্তারনামা দেন বাণীচিত্র ও চলচ্চিত্রের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ ফায়জুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, মূল লিজ গ্রহীতাদের পূর্বানুমতি ছাড়াই জমি বন্ধক রেখে ওয়ান ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেয় শান্তা হোল্ডিংস। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ওয়ান ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি এবং ২০১৬ সালে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ৯০ কোটি ৫৯ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া হয়।

এ নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। বাণীচিত্র ও চলচ্চিত্রের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী জমি বন্ধক রেখে ঋণ নিতে তাদের আলাদা অনুমতি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই শর্ত উপেক্ষা করা হয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আইনি জটিলতায় পড়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি। এ কারণে শান্তা হোল্ডিংসের কাছে তিন হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ, ঋণের অর্থ ব্যবহারের লাভ ও ১৫ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি সুদ দাবি করেছে তারা। পাশাপাশি বন্ধক থেকে জমি মুক্ত করার দাবিও জানিয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে, চারটি প্লট একীভূত করে ৪০ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন পায় শান্তা হোল্ডিংস। ২০২৬ সালের ২২ জুলাই রাজউক এ বিষয়ে অনুমোদনের চিঠি দেয়। তবে একাধিক আরবিট্রেশন ও রিভিশন মামলা বিচারাধীন থাকা এবং প্রক্রিয়াগত অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় সমালোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ আগস্ট প্লট একত্রীকরণের কার্যক্রম স্থগিত করে রাজউক।

জমি বরাদ্দ থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে গত ৯ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বাবর আলী মীরকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলেও এক মাস পর তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেন। ফলে তদন্ত কার্যক্রমও থমকে যায়।

এদিকে, বাণীচিত্রের পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমানের অভিযোগ, পাওয়ার অব অ্যাটর্নির সুযোগ নিয়ে শান্তা হোল্ডিংস প্রতারণা করেছে। তিনি চুক্তি বাতিল এবং জমি বন্ধক রাখার বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। ২০২৩ সালের আগস্টে দুই প্রতিষ্ঠান শান্তা হোল্ডিংসকে আমমোক্তারনামা বাতিলের নোটিশও দেয়।

তবে অপ্রত্যাহারযোগ্য আমমোক্তারনামা হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা রয়েছে। আইন অনুযায়ী, এ ধরনের দলিল একতরফাভাবে বাতিল করা যায় না; প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হয়। বাণীচিত্র ও চলচ্চিত্রের আইনজীবী বোরহান উদ্দিনের দাবি, বাতিলের নোটিশ জারির পর পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কার্যকারিতা স্থগিত থাকে এবং বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ডেভেলপার প্রকল্পের কাজ করতে পারে না।

আইনজীবীর আরও অভিযোগ, শান্তা হোল্ডিংস জমি বন্ধক রেখে নেওয়া অর্থ প্রকল্পের উন্নয়নে ব্যবহার না করে অন্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি গুলশান শপিং সেন্টারের দোকান মালিকদের পুনর্বাসন বা পাওনা পরিশোধের প্রতিশ্রুতিও পূরণ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।

অন্যদিকে, জমিতে নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে শান্তা হোল্ডিংস। সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরোনো ভবন ভেঙে জায়গাটি টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। নির্মাণকাজের জন্য বিভিন্ন উপকরণও রাখা হয়েছে। সেখানে প্রতিষ্ঠানের বিলবোর্ডে ২ হাজার থেকে ৬ হাজার ৫০০ বর্গফুটের অফিস স্পেসের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শান্তা হোল্ডিংসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কেউ বক্তব্য দেননি।

এনএনবাংলা/