রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় ১৯ নভেম্বর, মিয়ানমারের দায় নির্ধারণ ও ন্যায়বিচারের আশা বাংলাদেশের

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের দায় নির্ধারণে আগামী ১৯ নভেম্বর রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আদালতের শান্তি প্রাসাদে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় প্রকাশ্য অধিবেশনে এ রায় পড়বেন আদালতের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি ইউজি ইওয়াসাওয়া। আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এই রায়ে প্রথমবারের মতো কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি গণহত্যার জন্য দায়ী ঘোষণা করতে পারেন আদালত। রায়টির দিকে তাকিয়ে রয়েছে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকা রোহিঙ্গারা।
মঙ্গলবার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের কথা জানায় আদালত। আইসিজের এই রায় চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক হবে। এর বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নেই। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায়ের প্রভাব শুধু রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান গণহত্যা-সংক্রান্ত অন্য মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার করা ইসরাইলবিরোধী মামলা, যেখানে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তুলেছে দেশটি।
২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি করে। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, নির্যাতন ও গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হয় এতে। ওই অভিযানের পর প্রাণ বাঁচাতে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন, যা বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী বসতিগুলোর একটি।
গাম্বিয়ার এই উদ্যোগের পেছনে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সমর্থন ছিল। দেশটির যুক্তি, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদে স্বাক্ষরকারী প্রতিটি রাষ্ট্রেরই সনদটি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। তাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও গণহত্যার অভিযোগে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করার অধিকার গাম্বিয়ার রয়েছে। মামলাটিতে গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের বাইরে আরও ১১টি রাষ্ট্র অংশ নিয়েছে। দেশগুলো হলো বেলজিয়াম, কানাডা, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, মালদ্বীপ, নেদারল্যান্ডস, স্লোভেনিয়া ও যুক্তরাজ্য।
গণহত্যার অভিযোগে কী বলছে দুই পক্ষ
গাম্বিয়ার অভিযোগ, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সামরিক অভিযান চালায় মিয়ানমার। তৎকালীন সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা।
গণহত্যা সনদে এ অপরাধের চার ধরনের কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ রয়েছে। এগুলো হলো হত্যাকাণ্ড, শারীরিক বা মানসিকভাবে গুরুতর ক্ষতি করা, কোনো জনগোষ্ঠীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো জীবনযাপনের পরিস্থিতি তৈরি করা এবং জন্ম প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা নেওয়া। গাম্বিয়া বলছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের একমাত্র যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা হলো রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্য।
গাম্বিয়া প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা হত্যার তথ্য আদালতে তুলে ধরেছে। তবে মামলার সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী অ্যান্টোনিয়া মুলভির মতে, প্রকৃত হত্যার সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। এ ছাড়া কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের বিয়ে, সন্তান জন্মদান, চলাচল ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের বিষয়টিও আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অন্যদিকে মিয়ানমার শুরু থেকেই গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটির দাবি, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার জবাবে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছিল সেনাবাহিনী। ২০১৭ সালের আগস্টে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় আরসার হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য নিহত হয়েছিলেন বলেও দাবি করে দেশটি।
মিয়ানমারের বক্তব্য, সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করা ছিল না; বরং তাদের বিতাড়িত করাই ছিল লক্ষ্য। গণহত্যার উদ্দেশ্যের পক্ষে সরাসরি কোনো প্রমাণ নেই বলেও দাবি করেছে দেশটি। পাশাপাশি জাতিসংঘের তদন্ত মিশনের প্রতিবেদনকে প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করার যুক্তি দিয়েছে মিয়ানমার।
যৌন সহিংসতার ভয়াবহতা মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ
রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতার ধরন ও ব্যাপকতা মামলাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের হয়ে এসব ঘটনা তদন্ত করেছিলেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী অ্যান্টোনিয়া মুলভি। তিনি মিডল ইস্ট আইয়ের ‘এক্সপার্ট উইটনেস’ পডকাস্টে বলেন, গণহত্যার অভিযোগের পক্ষে গাম্বিয়ার যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে যৌন সহিংসতার ঘটনা।
মুলভির বর্ণনা অনুযায়ী, রাখাইনের মংডু, বুথিডং ও রাথিডং এলাকায় সেনাবাহিনীর অভিযানের সময় একই ধরনের সহিংসতার ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। প্রথমে সেনারা গ্রাম ঘিরে ফেলত, এরপর গুলি চালিয়ে বাড়িঘরে আগুন দিত। পরে নারী ও কিশোরীদের বেছে নিয়ে ধর্ষণ করত।
বেঁচে যাওয়া নারীদের কাছ থেকে দলবদ্ধ ধর্ষণ, পরিবারের সদস্যদের সামনে যৌন নির্যাতন, সামরিক শিবিরে কয়েক সপ্তাহ আটকে রাখা এবং যৌনাঙ্গ বিকৃত করার মতো ঘটনার বিবরণ পেয়েছেন তিনি। কোনো কোনো ঘটনায় একসঙ্গে ৪০ জন পর্যন্ত নারী ও কিশোরী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে জানান মুলভি।
এক নারী তাকে বলেছিলেন, ‘আমি ভাগ্যবতী ছিলাম, আমাকে মাত্র তিনজন ধর্ষণ করেছে।’ আরেক নারী জানিয়েছিলেন, আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে নয়জন পুরুষ ধর্ষণ করেছিল। তাদের অধিকাংশই ছিলেন সেনাসদস্য। ওই ঘটনায় তার গর্ভের সন্তান মারা যায়। নারীর এই বক্তব্য জাতিসংঘের তদন্ত মিশনের প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং পরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও তা পড়ে শোনানো হয়।
মুলভির মতে, যৌন সহিংসতার এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংসতার সামগ্রিক ধরন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইড এই মামলায় রোহিঙ্গা সাক্ষীদের প্রতিনিধিত্ব করছে।
১৯৯৮ সালে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক রায়ে ধর্ষণকেও গণহত্যার শামিল হিসেবে বিবেচনার আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও এই নীতি মেনে নিয়েছেন। তবে যৌন সহিংসতার ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রকে গণহত্যার জন্য দায়ী ঘোষণা করেনি আদালত। এবার এমন সিদ্ধান্ত এলে তা ঐতিহাসিক নজির হয়ে থাকবে বলে মনে করেন মুলভি।

ফাইল ছবি: রয়টার্স
যেভাবে এগিয়েছে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলা
২০১৮ সালে মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত মিশন জানায়, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে ধারণা করার মতো যথেষ্ট তথ্য রয়েছে। এ কারণে দেশটির সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারের সুপারিশ করে সংস্থাটি।
এর পরের বছর ১১ নভেম্বর গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মিয়ানমারের তৎকালীন বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চি নিজে আদালতে উপস্থিত হয়ে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে অন্তর্বর্তী আদেশে জানায়, গণহত্যা সনদের আওতায় রোহিঙ্গাদের অধিকার অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বাস্তব ও আসন্ন ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে মিয়ানমারকে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং এ-সংক্রান্ত প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০২২ সালের জুলাইয়ে মামলাটির বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে মিয়ানমারের আপত্তি খারিজ করে দেন আদালত। এরপর ২০২৬ সালের ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি মামলার মূল বিষয়ের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় রোহিঙ্গা সাক্ষীদের রুদ্ধদ্বার কক্ষে জবানবন্দি নেওয়া হয়। মিয়ানমার ২০২০ সালের অন্তর্বর্তী আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে আদালতে ১২টি প্রতিবেদন জমা দিলেও গাম্বিয়ার বক্তব্য, এসব প্রতিবেদন থেকে দেশটি আদালতের নির্দেশনা মেনে চলছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের দায় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলাটি কোনো ব্যক্তির অপরাধের বিচার নয়। এটি দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধ। ফলে আদালতের মূল বিবেচ্য বিষয় হলো, গণহত্যার জন্য রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমার দায়ী কি না। কোনো ব্যক্তি অপরাধী কি না, তা এই মামলার আওতাভুক্ত নয়।
গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলায় মূল বিষয়ের ওপর এটি হবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের তৃতীয় রায়। এর আগে ২০০৭ সালে বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসায় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল বলে রায় দেন আদালত। তবে গণহত্যা প্রতিরোধ ও অপরাধীদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সার্বিয়াকে দায়ী করা হলেও সরাসরি গণহত্যা সংঘটনের জন্য দেশটিকে দায়ী করা হয়নি। ২০১৫ সালে ক্রোয়েশিয়ার করা মামলায় সার্বিয়ার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে রায় দেন আদালত।
এবারের মামলায় বিচারকদের সামনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণে ‘একমাত্র যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা’ পরীক্ষাটি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে। কোনো জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্য থাকলে তা গণহত্যার উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু লিখিত নির্দেশনা বা নীতিমালার মতো সরাসরি প্রমাণ না থাকলে সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে সেই উদ্দেশ্য কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে, সেটিই মূল আইনি প্রশ্ন।
গাম্বিয়ার দাবি, ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা, ধরন ও নৃশংসতা গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। অন্যদিকে মিয়ানমার বলছে, এসব ঘটনার অন্য যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা রয়েছে এবং অভিযানটি ছিল আরসার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম।
মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের তদন্ত মিশনের সাবেক সদস্য ক্রিস সিডোটি মনে করেন, এই রায়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত কীভাবে ঘটনার সত্যতা নির্ধারণ করেন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনকে কতটা গুরুত্ব দেন, তা স্পষ্ট হবে। কারণ আদালতের নিজস্ব কোনো তদন্তকারী বিভাগ নেই। ফলে এই মামলায় বিচারকদের সামনে ঘটনার সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে রায়
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় আন্তর্জাতিক আইনের পাশাপাশি বিশ্বরাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সহকারী অধ্যাপক এবং আইসিজের সাবেক সহযোগী আইন কর্মকর্তা মাইক বেকার বলেন, তৃতীয় পক্ষের এতগুলো রাষ্ট্রের অংশগ্রহণে এই প্রথম কোনো মামলার মূল বিষয়ে রায় দিতে যাচ্ছে আদালত।
তার মতে, গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমারের মতো মামলা সমসাময়িক বিশ্বে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ভূমিকা ও কার্যক্রমের পরিধি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই মামলার ফলাফল নির্ধারণ করবে, ভবিষ্যতেও এ প্রবণতা অব্যাহত থাকবে কি না।
এদিকে গত অক্টোবরে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ গাম্বিয়ার নিয়োগ দেওয়া বিশেষ বিচারক নাভি পিল্লাইয়ের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, পিল্লাই গণহত্যা প্রমাণের আইনি মানদণ্ড শিথিল করার চেষ্টা করছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা সহজ হয়।
তবে মুলভি এ অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য, গাম্বিয়া গণহত্যা প্রমাণের আইনি মানদণ্ড শিথিল করার আবেদন করেনি; বরং বিদ্যমান মানদণ্ড পূরণের মতো যথেষ্ট প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করেছে।
রায়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাশা কী
রোহিঙ্গা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত মিয়ানমারকে গণহত্যার জন্য দায়ী ঘোষণা করবেন। একই সঙ্গে তাদের জমি ও সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া, ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হবে।
তবে রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের আওতায় মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করেছে বলে জানান মুলভি।
মাইক বেকারের মতে, মিয়ানমারকে গণহত্যার জন্য দায়ী করা হলে রোহিঙ্গাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিকারের বিষয়টি আদালত পরবর্তী কোনো পর্যায়ে বিবেচনার জন্য রেখে দিতে পারেন। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের মৌলিক অধিকার ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ আইন ও ব্যবস্থায় সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হলে তা হবে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।
মুলভি বলেন, কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গারা নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের কথা ভুলে যাননি। তারা অন্তত নিজেদের ওপর সংঘটিত অপরাধের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চান।
রায়ের পর কী করতে পারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় মেনে চলতে মিয়ানমার আইনগতভাবে বাধ্য। দেশটি রায় বাস্তবায়ন না করলে গাম্বিয়া বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তুলতে পারবে। তবে এখন পর্যন্ত আইসিজের কোনো রায় বাস্তবায়নে নিরাপত্তা পরিষদ তার ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি।
মাইক বেকারের মতে, মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আদালতের রায় কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার শর্ত হিসেবে আইসিজের রায় মেনে চলার বিষয়টি সামনে আসতে পারে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রায় এলে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য অন্য রাষ্ট্রগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির সরকারকে উৎখাত করেন মিন অং হ্লাইং। চলতি বছরের এপ্রিলে তিনি সেনাপ্রধানের পদ ছাড়েন। পরে সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট আইনপ্রণেতাদের নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট তাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। এদিকে অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে। রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা এখন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।
রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন ও নিপীড়নের অভিযোগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কৌঁসুলি। তখন তিনি মিয়ানমারের সেনাপ্রধান ছিলেন। তবে বিচারকেরা এখনো এ আবেদনের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। মুলভি ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পাশাপাশি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছেন।
এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আর্জেন্টিনার একটি আদালত মিয়ানমারের ২৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন। তাদের মধ্যে মিন অং হ্লাইং ও অং সান সু চিও রয়েছেন। বিশ্বের যেকোনো স্থানে সংঘটিত নৃশংস অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার রয়েছে—এমন আইনি নীতির ভিত্তিতে মামলাটি করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত আগের মামলার রায় ও আইনি নজির বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। তাই রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় ইউক্রেন বনাম রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইসরাইল, নিকারাগুয়া বনাম জার্মানি এবং গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র বনাম রুয়ান্ডার মতো বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে আগামী ১৯ নভেম্বরের রায় শুধু রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার দায় নির্ধারণ এবং রাষ্ট্রগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আদালতের সিদ্ধান্ত কী আসে, এখন সেই অপেক্ষায় বাংলাদেশসহ বিশ্ব সম্প্রদায়।
এনএনবাংলা/
