Skip to content

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) চলমান মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির মতে, বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ঘাটতি ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এসব উদ্বেগের কথা জানিয়েছে লন্ডনভিত্তিক সংস্থাটি।

এইচআরডব্লিউর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এর ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। একই সঙ্গে আইনের শাসন দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করা এবং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এইচআরডব্লিউ জানায়, গত ২৭ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৪১ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন প্রসিকিউটররা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে রাজনীতিক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন ব্যক্তির বিচার চলছে ট্রাইব্যুনালে।

১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালের আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন নির্যাতনের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে অনেক মামলায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যায্যবিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার প্রয়োজন। দুর্বল তদন্ত কিংবা ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে যাতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সুযোগ তৈরি না হয়, তা নতুন সরকারের নিশ্চিত করা উচিত।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ঘটনাসংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচারও করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ওই দমন-পীড়নে ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং হাজারো মানুষ গুরুতর আহত হন। পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।

এ ছাড়া শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগসহ অন্যান্য মামলাও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।

এইচআরডব্লিউ বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় গুরুতর অপরাধের বিচার করার জন্য গঠিত এই দেশীয় ট্রাইব্যুনালে চলমান এক ডজনের বেশি মামলার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছে তারা। এসব মামলার বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে গুরুতর উদ্বেগের কারণ পেয়েছে সংস্থাটি।

সংস্থাটির দাবি, একাধিক মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাদের নেওয়া সাক্ষ্যবিবৃতিতে একই ধরনের অনুচ্ছেদ হুবহু বা প্রায় একইভাবে একাধিক সাক্ষ্যের মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে। এতে এসব সাক্ষ্যবিবৃতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলে মনে করছে এইচআরডব্লিউ।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছয়টি বিচার সম্পন্ন করেছে। এসব মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধে ৬২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪২ জনের বিচার হয়েছে অনুপস্থিতিতে। এই তালিকায় শেখ হাসিনাও রয়েছেন। এ ছাড়া ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধেও দমন-পীড়নের অভিযোগ

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালের মার্চে শেখ হাসিনা সরকার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ওই সময় ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

তবে তখনও পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব, রাজনৈতিক পক্ষপাত, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের মধ্যে যোগসাজশ এবং ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার ঘাটতির অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার উদ্যোগ নেয়। তবে এইচআরডব্লিউর মতে, আন্তর্জাতিক আদালতগুলোর সমমানের বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য এসব সংশোধনী যথেষ্ট ছিল না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার এরপর আর কোনো সংশোধনী আনেনি।

এইচআরডব্লিউর দাবি, বর্তমান আইনে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই প্রসিকিউটররা গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারেন। আটক ব্যক্তিদের লিখিত কারণ না জানিয়েও মাসের পর মাস আটক রাখা সম্ভব। পাশাপাশি আলাদা আদালতে অন্তর্বর্তী আপিলের সুযোগও নেই।

সংস্থাটি আরও বলেছে, অভিযুক্তপক্ষকে প্রমাণ উপস্থাপনের মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে বিচার শুরু হতে পারে। ফলে আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রস্তুতির জন্য আসামিরা পর্যাপ্ত সময় পান না। অনুপস্থিতিতে বিচার হলেও নিজের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয় না। একই সঙ্গে আইনজীবীদের সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগও সীমিত।

এইচআরডব্লিউ আবারও বলেছে, তদন্ত কর্মকর্তাদের নেওয়া একাধিক সাক্ষ্যবিবৃতিতে একই অনুচ্ছেদ হুবহু কিংবা প্রায় একইভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা সাক্ষ্যবিবৃতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

এনএনবাংলা/